কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউএনএইচসিআর’র স্থায়ী শেল্টার নির্মাণ কার্যক্রম স্থানীয় জনমতের বিরুদ্ধে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে কক্সবাজারের স্থানীয় এনজিও ও জনপ্রতিনিধিরা। একইসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে একটি পৃথক “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন” গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
রোববার (১১ মে ২০২৬) কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) আয়োজিত “কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন সিসিএনএফ’র কো-চেয়ার রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোরও দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আসিয়ান (ASEAN) ফোরামে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে এবং আরাকান আর্মির সঙ্গেও আলোচনা প্রয়োজন। একইসঙ্গে কক্সবাজারের সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংসদে রোহিঙ্গা সংকট ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলো তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ইউএনএইচসিআরসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা স্থানীয় এনজিওগুলোকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে কাজ করার কথা থাকলেও স্থানীয় সক্ষমতাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
সিসিএনএফ’র সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সম্প্রতি ইউএনএইচসিআর ব্র্যাক ও ইনফিনিক্সের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী কাঠামোর ঘর নির্মাণ করছে, যা স্থানীয় সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, এসব নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নয় এমন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিশ্বে অন্য কোথাও শরণার্থীদের জন্য এ ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নজির নেই। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও রোহিঙ্গা প্রবেশের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সিসিএনএফ সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, UNOCHA ঘোষিত ১৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিলের ৯২ শতাংশ জাতিসংঘ সংস্থা এবং ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে গেছে। অথচ স্থানীয়করণ নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত ২৫ শতাংশ তহবিল সরাসরি স্থানীয় এনজিওদের পাওয়ার কথা ছিল।
তিনি জাতীয় সংসদে এমন আইন প্রণয়নের দাবি জানান, যাতে স্থানীয় এনজিও ছাড়া জাতিসংঘের কোনো সংস্থা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারে। পাশাপাশি যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা (JRP) স্থানীয় এনজিওদের জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, স্থানীয় এনজিওদের জন্য গঠিত পুল ফান্ডের বড় অংশ জাতীয় পর্যায়ের এনজিওগুলো পাচ্ছে। তিনি এই তহবিল স্থানীয় এনজিও কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে কর্মরত অনেক আন্তর্জাতিক এনজিও ও জাতিসংঘ সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশি নাগরিকরা দায়িত্ব পালন করছেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। এসব পদে স্থানীয় ও বাংলাদেশি নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিইএইচআরডিএফ’র প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশকর্মী মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের কারণে প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে, যা কক্সবাজারের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নাফ নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তানজির উদ্দিন রনি বলেন, রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে (RCT) স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিনিধি নেই। ফলে স্থানীয় জনগণের মতামত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি জনপ্রতিনিধিদের এই কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়ছে। এ অবস্থায় জবাবদিহিমূলক একটি “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন” গঠন জরুরি, যা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরবে।
কম্বাইন হিউম্যান রাইটস ওয়ার্ল্ডের কেন্দ্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হাসান বলেন, বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) ভেন্ডরশিপ কার্যক্রম রোহিঙ্গাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করছে, যা সঠিকভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে প্রায় ৩০০ একর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই এবং এ বিষয়ে কী আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা স্থানীয় জনগণ জানে না। তিনি অভিযোগ করেন, উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর জাতীয় নীতির অভাব রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত বছর জেনেভায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
