সংসারের অভাব দূর করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে ২১ বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার আব্দুল জব্বার ওরফে নূর মোহাম্মদ (৪০)। দীর্ঘ দুই যুগের প্রবাসজীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আর জীবিত অবস্থায় ফেরা হলো না তার। অবশেষে কফিনবন্দি মরদেহ হয়ে জন্মভূমিতে ফিরলেন এই প্রবাসী শ্রমিক।
শুক্রবার (১৫ মে) পাকুন্দিয়া উপজেলার বুরুদিয়া ইউনিয়নের কাগারচর গ্রামের বাড়িতে জুমার নামাজের পর জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহায়তায় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ পাকুন্দিয়া উপজেলার কাগারচর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা, বাবা, স্ত্রী ও স্বজনরা। প্রিয়জনের আহাজারিতে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
নিহত আব্দুল জব্বার পাকুন্দিয়া উপজেলার বুরুদিয়া ইউনিয়নের কাগারচর গ্রামের আব্দুল বাতেন মিয়ার ছেলে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২১ বছর আগে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে আল জাহারান কোম্পানিতে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রবাসের কঠিন জীবনযুদ্ধের মধ্যেও পরিবারের খরচ, বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব একাই বহন করতেন তিনি।
স্বজনরা জানান, আব্দুল জব্বারের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল পরিবারের সদস্যদের সুখে রাখা। বছরের পর বছর প্রবাসে কাটালেও মন পড়ে থাকত গ্রামের বাড়িতে। প্রায়ই পরিবারের সদস্যদের বলতেন, “আর কিছুদিন কষ্ট করি, তারপর দেশে ফিরে সবাইকে নিয়ে ভালোভাবে থাকব।” কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
জানা গেছে, গত ১০ আগস্ট সৌদি আরবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুল জব্বার। পরে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২০ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর মরদেহ সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়। এদিকে আব্দুল জব্বারের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের সদস্যরা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চান। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বৃহস্পতিবার দুপুরে মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয় এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ঢল নামে বাড়িতে। শেষবারের মতো প্রবাসী জব্বারকে এক নজর দেখতে ভিড় করেন শত শত মানুষ। অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “পরিবারের জন্য নিজের জীবনটাই বিদেশে কাটিয়ে দিল মানুষটা।”
স্থানীয়রা জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে পুরো পরিবার। ছোটবেলা থেকেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া জব্বার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন প্রবাসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের স্বপ্ন পূরণ না করেই কফিনবন্দি হয়ে ফিরতে হলো জন্মভূমিতে।
নিহতের মা মনোয়ারা খাতুন আহাজারি করতে করতে বলেন,“আমার ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করছে। সংসারের অভাব দূর করতে নিজের সুখ-শান্তি সব বিসর্জন দিয়ে বিদেশে গেছে। আমাদের ভালো রাখার জন্য জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই প্রবাসে কাটাইছে। কত কষ্ট করে টাকা পাঠাইছে, আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করছে। সবসময় বলত, ‘মা, আর কিছুদিন কষ্ট করি, তারপর দেশে এসে তোমাদের নিয়ে শান্তিতে থাকব।’ আমরা সবাই সেই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আমার ছেলেটা আর জীবিত অবস্থায় ফিরল না। লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরবে, এটা কোনোদিন কল্পনাও করিনি। একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছু হতে পারে না।”
স্ত্রী মোছা. নুপুর আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“সংসারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই বিদেশে কাটাইছে ও। বিয়ের পর থেকেই আমাদের সুখের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছে। নিজের কষ্টের কথা কখনো বলত না, শুধু বলত—‘আর কিছুদিন ধৈর্য ধরো, তারপর দেশে এসে সবাইকে নিয়ে সুখে থাকব।’ সবসময় চাইত পরিবারকে নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচতে। কিন্তু সেই মানুষটাই আজ কফিনবন্দি হয়ে ফিরল।
নিহতের বাবা আব্দুল বাতেন বলেন, “আমার ছেলে পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিল। দীর্ঘ ২১ বছর বিদেশে থেকে আমাদের জন্য কষ্ট করেছে। বয়স বাড়ার পরও সে নিজের কথা না ভেবে সবসময় পরিবারের কথাই চিন্তা করেছে। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। তখন সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল মরদেহ দেশে আনতে কত সময় লাগবে। কিন্তু সরকারের সহায়তায় খুব দ্রুত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আবেদন করার ১৭-১৮ দিনের মধ্যেই আমার ছেলের মরদেহ দেশে এসেছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।”
নিহতের খালাতো ভাই সোলাইমান বলেন, “আগে প্রবাসে কেউ মারা গেলে মরদেহ দেশে আনতে অনেক জটিলতা ও দীর্ঘ সময় লাগত। পরিবারের সদস্যদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। কিন্তু এবার খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। এতে পরিবার অন্তত শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে পেরেছে। সরকারের এই সহযোগিতা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ হয়েছে। আমরা এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই।”
চাচাতো ভাই মো. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “আব্দুল জব্বার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার মৃত্যুতে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাফন-কাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা এই মুহূর্তে পরিবারের জন্য অনেক উপকারে আসবে। এছাড়া ভবিষ্যতেও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করা হবে।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা যুব অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান আহমেদ রমজান বলেন, “বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে প্রবাসীদের মরদেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমি নিজে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং আমাদের নেতা নুরুল হকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছি। আব্দুল জব্বারের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সৌদি কোম্পানির সঙ্গে তার কাজের হিসাব-নিকাশ করে পাওনা অর্থ দেশে আনার ব্যবস্থাও করা হবে।”
