অক্টোবর ১৯১৭। আটলান্টিক মহাসাগর তখন ঝড়ে উত্তাল। নিউ ইয়র্কগামী একটি যাত্রীবাহী জাহাজে আছেন ২৮ বছর বয়সী ইতালিয়ান কাঠমিস্ত্রি আন্তোনিও রুসো এবং তার পাঁচ বছরের মেয়ে মারিয়া। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে আন্তোনিওর স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন। আমেরিকাই ছিল তাদের ভবিষ্যতের শেষ আশ্রয়।
রাত ২টায় একটি বিশাল ঢেউ জাহাজে আঘাত করল। তৃতীয় শ্রেণির নিচের ডেকগুলো পানিতে ডুবে গেল। জাহাজ হঠাৎ একদিকে কাত হয়ে গেল। আতঙ্ক, চিৎকার, সিঁড়িতে মানুষের ঠেলাঠেলি। আন্তোনিও মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন, পানির উপর তাকে ধরে রেখে। কিন্তু ভিড় ছিল অনেক বেশি, আর সময়ও ফুরিয়ে আসছিল। তিনি বুঝতে পারলেন— লাইফবোট পর্যন্ত পৌঁছানো আর সম্ভব হবে না।
সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে আন্তোনিও একটি ভাঙা পোর্টহোলের জানালার কাছে পৌঁছালেন। একটি ছোট শিশু খুব কষ্টে হয়তো সেখান দিয়ে বেরোতে পারবে। ওপারে— কালো, বরফশীতল আটলান্টিকের পানি। দূরে লাইফবোটের সার্চলাইট জ্বলছিল। মারিয়া কাঁদছিল, মায়ের জন্য ডাকছিল, বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। তিনি শেষবারের মতো মেয়ের দিকে তাকালেন… এবং তাকে পোর্টহোল জাহাজের এই জানালা দিয়ে দিয়ে ঠেলে দিলেন।
মারিয়া চিৎকার করতে করতে সমুদ্রে পড়ে গেল। আন্তোনিও ঝড়ের গর্জনের উপর দিয়ে চিৎকার করে বললেন — “সাঁতার কাটো, মারিয়া! আলোর দিকে সাঁতার কাটো! নৌকাগুলো কাছেই! সাঁতার কাটো!” সাত মিনিট পরে জাহাজটি ডুবে গেল। আন্তোনিও রুসো তৃতীয় শ্রেণির ১১৭ জন যাত্রীর সাথে মারা গেলেন। তার দেহ কখনো পাওয়া যায়নি।
মারিয়াকে ৪৫ মিনিট পরে পানি থেকে তোলা হলো— জীবিত, কিন্তু তীব্র হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত। একটি পাঁচ বছরের মেয়ে, একা এক অজানা দেশে এসে পড়েছে, ইংরেজি একটি শব্দও জানে না। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সে বিশ্বাস করেছিল— বাবা তাকে ছেড়ে গেছেন। তাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিলেন কারণ মেয়ে হিসেবে সে আর দরকারি ছিল না। ৩০ বছর বয়সে গিয়ে সে জানতে পারল সত্যিটা— তার বাবা জেনেশুনে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিলেন, যাতে মেয়ে একটু হলেও বাঁচার সুযোগ পায়।
মারিয়া রুসো দীর্ঘ জীবন বেঁচে ছিলেন, ৯২ বছর পর্যন্ত (২০০৪ সালে তিনি মারা যান)। তার চারটি সন্তান, নয়জন নাতি-নাতনি, ছয়জন প্রপৌত্র-প্রপৌত্রী— মোট ৩১ জন বংশধর সবাই জন্মেছিল কারণ সেই রাতে একজন মানুষ একটি অসম্ভব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
৮৩ বছর বয়সে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর এই গল্পের কথা বলেছিলেন— “আমি ভেবেছিলাম আমার বাবা আমাকে মেরে ফেলছেন… বুঝিনি যে তিনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। অনেক বছর ধরে ভেবেছি তিনি আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। সত্যিটা হলো— তিনি আমাকে জীবনের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।”
প্রতিটি জন্মদিনে তিনি বাবার সেই কণ্ঠস্বর শুনতেন “আলোর দিকে সাঁতার কাটো। ৭৮ বছর ধরে আমি সেই আলোর দিকেই সাঁতার কেটেছি। আশা করি বাবা আমাকে নিয়ে গর্বিত।”
বাবাকে নিয়ে তার শেষ কথাগুলো ছিল সহজ, সরল “ধন্যবাদ, বাবা। আমাকে জীবন দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
যে বাবা তার মেয়েকে বরফশীতল সমুদ্রে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন… তাকে বাঁচাতে।
বেঁচে থাকুক সব বাবা বেঁচে থাকুক সান সন্তানের বটবৃক্ষ
এই সেই বাবা যে বাবা তার বাচ্চাকে বরফের সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল

ছবি: সংগৃহীত