‘টানা ১৩ দিন পর বেঙ্গালুরু বাই বাই’-চিকিৎসা শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই একটি লাইন লিখেছিলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। ছোট্ট বাক্যটির মধ্যেই যেন ছিল দীর্ঘ চিকিৎসার ধকল শেষে বাড়ি ফেরার স্বস্তি, প্রিয়জনদের কাছে ফেরার আনন্দ। কিন্তু কে জানত, বেঙ্গালুরুকে জানানো সেই বিদায়ই হয়ে উঠবে তার জীবনেরও শেষ বিদায়!
বুধবার সকালেই দেশে ফেরার কথা ছিল দেবাশীষ ও তার পরিবারের। কুষ্টিয়ার বাড়িতে অপেক্ষায় ছিলেন বাবা-মা, স্বজন আর একমাত্র মেয়ে মহিমা (৮)। কিন্তু তার আগের রাতেই কলকাতার একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিল দেবাশীষসহ একই পরিবারের চারজনের প্রাণ। নিহতরা হলেন-সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত,তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন,মাত্র তিন বছর বয়সী ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেন। তাদের মরদেহ এখনো কলকাতায় রয়েছে।
স্বজনরা জানান, গত ৩ আগস্ট চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে যান দেবাশীষ। বেঙ্গালুরুতে টানা ১৩ দিনের চিকিৎসা শেষে শুরু করেছিলেন বাড়ি ফেরার যাত্রা। বেঙ্গালুরু থেকে ফিরে মঙ্গলবার কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ওঠেন তারা। পরিকল্পনা ছিল, রাতটুকু হোটেলে কাটিয়ে পরদিন সকালেই বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন। দেশে ফেরার আগে কলকাতায় সেটিই ছিল তাদের শেষ রাত।
মধ্যরাতের পর রাত আড়াইটার দিকে হোটেল ভবনের তিনতলায় হঠাৎ আগুন লাগে। মুহূর্তেই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ভবন। সরু সিঁড়ি আর ঘন ধোঁয়ার মধ্যে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি দেবাশীষ ও তার পরিবারের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত আগুনে প্রাণ হারান চারজনই।
মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর পর থেকেই শহরের আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষের বাড়ির দৃশ্য বদলে গেছে। যে বাড়িতে কয়েক ঘণ্টা পর প্রিয়জনদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি আর অপেক্ষা ছিল, সেখানে এখন শুধুই শোক আর কান্না। স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের ভিড়ে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত, মা স্বপ্না দত্ত ও ও মেয়ে মহিমা। তাদের এখন একটাই চাওয়া। যত দ্রুত সম্ভব সন্তান, পুত্রবধূ, নাতি ও বেয়াইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার সময় পরিবারের সঙ্গে যায়নি দেবাশীষের একমাত্র মেয়ে। কুষ্টিয়ায় বাবা-মায়ের কাছে থেকে সে অপেক্ষা করছিল বাবা, মা, ছোট ভাই আর দাদুর ফিরে আসার।
বুধবার তাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। হয়তো ছোট্ট মেয়েটিরও হিসাব ছিল। আর মাত্র একটি রাত। তারপরই ফিরে আসবে তার আপন মানুষগুলো।
কিন্তু একটি আগুন বদলে দিয়েছে সব হিসাব। যে চারজনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল সে, এখন তাদের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষা চলছে।
দেবাশীষ দত্ত ছিলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতা অঙ্গনের পরিচিত মুখ। তিনি দৈনিক আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। এরআগে আরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।
দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা বলছেন,কর্মঠ ও প্রাণবন্ত দেবাশীষের এমন আকস্মিক চলে যাওয়া তাদের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন। একজন সহকর্মীকে হারানোর পাশাপাশি একই দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী, শিশুসন্তান ও শ্বশুরের মৃত্যু পুরো সাংবাদিক সমাজকে নাড়া দিয়েছে।
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ জুবায়ের রিপন ও সাবেক সভাপতি আল-মামুন সাগরসহ সাংবাদিক নেতারা দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
চিকিৎসা শেষে সুস্থতার আশা নিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিল একটি পরিবার। সামনে ছিল মাত্র একটি রাতের অপেক্ষা। তারপর সীমান্ত পেরোলেই বাংলাদেশ, তারপর কুষ্টিয়ার নিজের বাড়ি।
কুষ্টিয়ার বাড়িতে এখনো অপেক্ষা চলছে। তবে সেই অপেক্ষা আর দরজায় দাঁড়িয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে বরণ করে নেওয়ার নয়,শেষবারের মতো তাদের মুখ দেখার।
ফেসবুকে দেবাশীষ লিখেছিলেন-‘টানা ১৩ দিন পর বেঙ্গালুরু বাই বাই।’ তিনি হয়তো তখন জানতেন না, বাড়ি ফেরার সেই আনন্দযাত্রার মাঝপথেই জীবন তাকে বলবে-শেষ বিদায়।
