দেবাশীষসহ পরিবারের ৪ জনের শেষবিদায়: কুষ্টিয়ায় পৃথক রীতিতে সৎকার-দাফন

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ ছয় বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম হোসেনের মরদেহ শনিবার বিকেল ৫টার দিকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে আসে।

প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে চারজনের মরদেহ কুষ্টিয়ার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মরদেহগুলো কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষ দত্তের ভাড়া বাসায় পৌঁছায়। পরে আফসানা শারমীন ও আকরাম হোসেনের মরদেহ তাঁদের স্বজনদের উপস্থিতিতে থানা পাড়ার শ্বশুরবাড়িতে নেওয়া হয়।

পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পৃথক ধর্মীয় রীতিতে একই রাতে চারজনের শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন করা হয়। সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ দত্তের মরদেহ কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে সৎকার করা হয়। পরে বাবা ও ছেলেকে পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হয়।

অন্যদিকে, দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীন ও শ্বশুর আকরাম হোসেনকে রাত ৩টার দিকে কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে মুসলিম ধর্মীয় রীতিতে দাফন করা হয়।

এর আগে শনিবার দুপুরে সহকর্মীর মরদেহ গ্রহণ করতে কুষ্টিয়া থেকে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের সহকর্মী, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা বেনাপোল সীমান্তে যান। মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর তাঁরা সেগুলো গ্রহণ করে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হন।

কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আলমামুন সাগর বলেন, “আমাদের সহকর্মী দেবাশীষ দত্তসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, নিহত পরিবারগুলোকে দ্রুত ক্ষতিপূরণসহ প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দেওয়া হোক।”

মরদেহগুলো বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে শেষবারের মতো প্রিয়জনদের একনজর দেখতে সেখানে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। দেবাশীষের কর্মস্থল ‘আজকের পত্রিকা’ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন গণমাধ্যম সংগঠনের প্রতিনিধিরা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

এ সময় কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত। নিজেকে সামলে তিনি বলেন, “ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দেবাশীষের উপার্জনেই আমাদের পরিবার চলত। এখন আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। এই অবস্থায় সরকারের কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।”

একইভাবে শোকে কাতর দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত। ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে একসঙ্গে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনোভাবেই তাঁর কান্না থামছিল না।

দেবাশীষের বেঁচে থাকা সাত বছরের মেয়ে মহিমা দত্ত এখনো প্রিয়জন হারানোর গভীরতা বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা অর্জন করেনি। সে শুধু বুঝতে পারছে, তার বাবা, মা ও ছোট ভাই আর নেই। বারবার তাদের দেখতে চেয়ে আবদার করছে সে।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশীদ বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারের সদস্যদের ২৫ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মেয়ের জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহগুলো মর্গে রাখা হয়। শুক্রবার রাতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে কফিনবন্দী মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শনিবার দুপুরে মরদেহগুলো বাংলাদেশে পাঠানো হয়।

গত ৩ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছোট ছেলে স্বর্ণশীষকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। কয়েক দিন পর তাঁর শ্বশুর আকরাম হোসেনও কলকাতায় যান। চিকিৎসা শেষে গত বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার সেই অপেক্ষা শেষ হয় মর্মান্তিক পরিণতিতে—কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফেরেন দেবাশীষ, তাঁর স্ত্রী, শিশুপুত্র ও শ্বশুর।

Exit mobile version