কেউ হয়তো পথ হারিয়েছিলেন, কেউ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, কেউবা জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন সম্পূর্ণ একা। মৃত্যুর পরও যাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো স্বজন পাওয়া যায়নি, তাদের শেষ বিদায়ের দায়িত্ব নিয়েছে একটি দল। নাম—‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’।
পরিবারের সন্ধান নেই, পরিচয়ও অজানা—এমন মানুষের শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করাই যেন এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নীরব অঙ্গীকার। গত চার বছরে সংগঠনটি ২৬৮টি বেওয়ারিশ মরদেহের দাফন সম্পন্ন করেছে। স্বজনহীন এসব মানুষের জন্য তারাই হয়ে উঠেছে শেষ সময়ের আপনজন।
সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট সরাইল উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে একাধিক গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে আনুমানিক ২০ বছর বয়সী এক যুবক নিহত হন। খাটিহাতা হাইওয়ে থানা পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এরপর প্রায় ছয় দিন ধরে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর স্বেচ্ছাসেবীরা নিহত যুবকের পরিচয় ও পরিবারের সন্ধান চালান।
কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কেউ মরদেহটির দাবি নিয়ে এগিয়ে আসেননি। শেষ পর্যন্ত পরিচয়হীন সেই যুবককে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। আর এই দাফনের মধ্য দিয়ে ২৬৮ জন বেওয়ারিশ মানুষের শেষ বিদায়ের দায়িত্ব পালনের মাইলফলক স্পর্শ করে সংগঠনটি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার পূর্ব মেড্ডা সার গুদামের পাশে তিতাস নদীর পাড়সংলগ্ন একটি স্থানে এসব বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়। তবে কবরস্থানটি নিচু হওয়ায় বর্ষাকালে সেখানে পানি জমে যায়। ফলে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবীদের দাফনকাজ সম্পন্ন করতে হয়।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার মধ্যপাড়ার বাসিন্দা তরুণ প্রকৌশলী মো. আজহার উদ্দিন প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। তিনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, আলেমসহ একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানবিক এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সড়ক দুর্ঘটনা, ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু, পানিতে ডুবে মৃত্যু, হত্যাকাণ্ড কিংবা অর্ধগলিত মরদেহ—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, মানবিক এই দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যান না তারা। শুধু দাফনেই থেমে থাকেনি তাদের কার্যক্রম। পরিচয়হীন ব্যক্তিদের পরিবারের সন্ধান করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করে সংগঠনটি।
করোনাকালে অসুস্থ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অক্সিজেন সেবা দেওয়ার কাজও করেছেন সংগঠনের সদস্যরা।
নদী রক্ষা সামাজিক সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, “বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন একটি অত্যন্ত মানবিক কাজ। জীবনের শেষ সময়ে যখন কোনো মরদেহের ওয়ারিশ পাওয়া যায় না, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর সেই মরদেহের ওয়ারিশ হয়ে পাশে দাঁড়ায়। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং পরিবারের সন্ধান করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজও করছে সংগঠনটি।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আজহার উদ্দিন বলেন, “২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে আমাদের কার্যক্রম শুরু। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অর্থায়নে এখন পর্যন্ত ২৬৮টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করেছি। জেলার বিভিন্ন থানা থেকে চিঠি পেয়ে নিয়মিত মরদেহ নিয়ে এসে দাফনের ব্যবস্থা করি।”
তিনি আরও বলেন, “বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের কবরস্থানটি নিচু হওয়ায় বর্ষাকালে সেখানে পানি উঠে যায়। এতে দাফনকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। পৌরসভা বা জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে মাটি ফেলে জায়গাটি উঁচু করে দেওয়া হলে বর্ষাকালে দাফনকাজ সহজ হবে। এ মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সমাজের বিত্তবানদেরও সংগঠনটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।”
স্বজনহীন মানুষের শেষ বিদায়ে পাশে দাঁড়ানো—শুনতে হয়তো এটি একটি সাধারণ দায়িত্ব। কিন্তু যে মানুষটির মৃত্যুর পরও কেউ তার পরিচয় জানতে আসে না, তার শেষ ঠিকানার ব্যবস্থা করা নিঃসন্দেহে এক গভীর মানবিক দায়বদ্ধতা।
পরিচয়হীন মানুষের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—মানুষের পরিচয় হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানবিক দায়িত্ব হারিয়ে যাওয়ার নয়।
২৬৮টি বেওয়ারিশ মরদেহের শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করে সংগঠনটি তাই শুধু দাফনের কাজ করছে না; তারা স্বজনহীন মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে এক মানবিক আশ্রয়, এক নীরব ‘ওয়ারিশ’—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাতিঘর।
