অবশেষে মিলল তারিখ, ২৭ বছর পর শুরু হচ্ছে ৯/১১ হামলার বিচার

ঘটনার ২৭ বছর পর অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে ৯/১১ হামলার বিচার। একটি মার্কিন সামরিক আদালতের বিচারক বুধবার ৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং তার তিন সহযোগীর বিচারের জন্য ২০২৮ সালের ৫ জুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

অবশ্য প্রসিকিউটররা ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে বিচার শুরুর আবেদন করেছিল। কিন্তু বিচারক তারচেয়ে ১৮ মাস পিছিয়ে বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ করেন। বিচারক বিমানবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইকেল এ শ্রামা তার আদেশে লিখেছেন, বিচার শুরুর আগের বিরোধগুলো মেটাতে এই অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন। যার মধ্যে বিচারে কোন কোন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা যাবে, তা নিয়ে মতদ্বৈধতাও রয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং একের পর এক আসা পরবর্তী সরকারগুলো আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই হামলার পরিকল্পনাকারীকে বিচারের মুখোমুখি করতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে লড়াই করছে।

২০২৮ সালের এই বিচার প্রক্রিয়াটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন লক্ষ্য ও মাইলফলক অর্জনের ওপর নির্ভর করছে এবং এটি আবারও পিছিয়ে যেতে পারে। এর আগে ২০২১ সালেও একবার বিচারের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা পরে বাতিল হয়ে যায়। খালিদ শেখের বিরুদ্ধে অপহৃত যাত্রীবাহী বিমানগুলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং পেন্টাগনে আছড়ে ফেলার পরিকল্পনা তৈরি ও তা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।খালিদ শেখের সঙ্গে তার তিন সহযোগী : ওয়ালিদ বিন আত্তাশ, আলী আব্দুল আজিজ আলী এবং মুস্তফা আল-হাউসাভিরও বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। অভিযুক্তরা এখন কিউবার গুয়ান্তানামো বে-তে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আটকে রাখা শেষ বন্দিদের অন্যতম।
বিচারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেই ২০২৪ সালে আসামিদের সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ার কথা ছিল, যেখানে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ডের শর্তে তারা দোষ স্বীকার করতে রাজি হয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক বিতর্ক ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের আপত্তির কারণে পরবর্তীতে জো বাইডেন প্রশাসন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ সেই চুক্তি বাতিল করে দেয়। ফলে মামলাটি আবার সাধারণ বিচার প্রক্রিয়ায় ফিরে গেছে।২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যে হামলা চালায়। দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারের দুটি টাওয়ারই ধ্বংস করে দেয়। তৃতীয় বিমানটি আছড়ে পড়ে মার্কিন সামরিক দপ্তর পেন্টাগনে। যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভেনিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের ইতিহাসে ভয়াবহ এ হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।

৯/১১ হামলার প্রায় ২৫ বছর পরও এর বিচার শুরু করতে না পারাকে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং খোদ ভুক্তভোগীদের পরিবারের একটি বড় অংশ আইনি ব্যবস্থার এক বিরাট ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন। হামলায় নিহত অনেক ভুক্তভোগীর বাবা-মা বা বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়রা কোনো বিচার না দেখেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং তার সহযোগীদের বিচার মূলত আইনি এবং পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে আটকে আছে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এই আসামিদের গ্রেপ্তারের পর গোপন কারাগারে রেখে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের নামে ওয়াটারবোর্ডিংসহ ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন করেছিল।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া জবানবন্দি আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ফলে, কোন প্রমাণ বৈধ আর কোনটা অবৈধ; তা নির্ধারণ করতেই বিচারপূর্ব বিতর্কেই ২০ বছরের বেশি সময় নষ্ট হয়েছে। মার্কিন বেসামরিক আদালতে বিচার না করে গুয়ান্তানামো বে-র বিশেষ সামরিক আদালতে এই বিচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই আদালতের নিজস্ব নিয়মকানুন এবং আইনি বৈধতা নিয়ে বারবার সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ হয়েছে, যা প্রক্রিয়াটিকে অন্তহীনভাবে দীর্ঘায়িত করেছে।

প্রধান অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদসহ অন্যরা ২০০৩ সাল থেকে বন্দি। কোনো চূড়ান্ত রায় ছাড়া দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাউকে এভাবে আটকে রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। ৯/১১ হামলার বিচার মার্কিন বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম এবং জটিলতম একটি অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের চোখে এই দীর্ঘসূত্রতা মার্কিন বিচার ব্যবস্থার একটি বড় ব্যর্থতা। তবে আইনগতভাবে এটি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল মামলা, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিশোধের চেয়ে আইনের মর্যাদা রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Exit mobile version