রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ রাখতে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
তিনি বলেছেন, যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলে উৎসস্থলেই পচনশীল ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করতে হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কংক্রিটের ইট এমনকি তেলও উৎপাদন করা সম্ভব।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর হাজারীবাগ বউবাজার বালুর মাঠে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের মতো সামাজিক সংগঠন ও এনজিওগুলো শুধু সমালোচনা না করে সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে নগরীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধান সহজ হবে। জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বিএনপি ব্যতিক্রমধর্মী রাজনীতি করতে চায়, শুধু কথা নয়—কাজের রাজনীতি করতে চায়। এ কারণে মাঠপর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধনসহ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকতে বলা হয়েছে।
ঢাকাকে ‘ক্লিন ও গ্রিন’ রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে ঢাকা মহানগর বায়ুদূষণের দিক থেকে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ১ থেকে ৮-এর মধ্যে অবস্থান করছে, যা কোনোভাবেই মঙ্গলজনক নয়। নগরবাসীকে দূষিত বায়ু থেকে রক্ষা করতে বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। গাছ কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন দেয়। পাশাপাশি যানবাহন থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণ কমাতেও উদ্যোগ নিতে হবে।
পুরান ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে আবদুস সালাম বলেন, অধিকাংশ ড্রেন দীর্ঘদিনে অকেজো ও বন্ধ হয়ে গেছে। ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অনেক জায়গায় একাকার হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে না পেরে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এ সমস্যা সমাধানে পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থাই পরিবর্তন করতে হবে।
তিনি বলেন, ধানমন্ডি থেকে আগা সাদেক সড়ক দিয়ে আগে যে পানি বিডিআরের ভেতর দিয়ে চলে যেত, সেই আউটলেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিউমার্কেট ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় পানি জমে। এ সমস্যা সমাধানে সিটি কর্পোরেশন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তবে দুই-তিন মাসে বড় ধরনের ড্রেনেজ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। আগামী বছর যাতে জলাবদ্ধতা না হয়, সেই লক্ষ্যেই কাজ করা হচ্ছে।
নগরীর হকারদের উদ্দেশে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, হকাররাও বাংলাদেশের নাগরিক এবং ঢাকা শহর পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তাদেরও রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় রাস্তার ময়লা ড্রেনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ভাঙা টেলিভিশন, খাতা, বালিশ, পলিথিনসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ড্রেনে ফেলার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় বিকল হয়ে পড়েছে। জনগণ সচেতন না হলে শুধু সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি জানান, সিটি কর্পোরেশনের ভূগর্ভস্থ ড্রেনগুলোও পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গরিব-ধনী সবাইকে নিজেদের ঘর এবং আশপাশের রাস্তা পরিষ্কার রাখতে হবে। রাস্তার পাশে বা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা যাবে না। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদেরও নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত হতে হবে। এ কাজে সিটি কর্পোরেশন সহযোগিতা করবে।
মশক নিধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত বছর মশার উপদ্রব অনেক বেশি থাকলেও বর্তমানে তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভবিষ্যতে মশার উপদ্রব আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, যদি নাগরিকরা সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিচে ও আশপাশে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা জন্মায়। সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে। নাগরিকরা সচেতন হলে মশার হাত থেকেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
যানজট নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে আবদুস সালাম বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে সৃষ্ট যানজট নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। একই সঙ্গে হকারদের রাস্তা ও ফুটপাত দখলের কারণে যে যানজট সৃষ্টি হয়, সেটিও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সবাই ফুটপাত দখল করে বসে গেলে শুধু ডিএসসিসির একার পক্ষে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’র মতো কার্যক্রম শুরু করা হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ যখন ঢাকা শহরে আসবে, তখন শহর জঞ্জালে ভরা থাকলে তারা ভালো ধারণা নিয়ে ফিরবে না। কোথাও আবর্জনা বা কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা গেলে নগরবাসীকে তা সিটি কর্পোরেশনকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
নগরবাসীর অভিযোগ জানানোর জন্য ‘ক্লিন কেয়ার’ অ্যাপ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, কোথাও ময়লা জমে থাকলে, সড়কের বাতি বন্ধ থাকলে কিংবা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে ওই অ্যাপের মাধ্যমে জানাতে হবে। সিটি কর্পোরেশন বিষয়টি জানার পর ব্যবস্থা নেবে। ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলে একদিনের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কোনো সড়কের বাতি না জ্বললে জানালেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি সিটি কর্পোরেশনের কোনো কর্মচারী দায়িত্বে ফাঁকি দিলে বা কাজ না করলেও তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন রাস্তা পরিষ্কার এবং নিয়মিত আবর্জনা অপসারণ করতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের প্রত্যেককে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আবদুস সালাম বলেন, মহানগর ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের রাজনীতির ধরন পরিবর্তন করতে হবে। জনগণের সুযোগ-সুবিধার জন্য রাজনীতি করতে হবে এবং দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। জনগণ কী চায়, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। গত ১৭ বছরে যে ধরনের রাজনীতি হয়েছে এবং যুব ও ছাত্র সংগঠনগুলো যে কর্মকাণ্ড করেছে, নতুন সরকারে তা চলতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান’ ঢাকা শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। ক্লিন ঢাকা ও গ্রিন ঢাকা গড়তে কাজ করা হচ্ছে। নগরবাসীর জন্যই একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ঢাকা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়েছে। শহরকে গ্রিন ও ক্লিন রাখতে হলে সবার সচেতনতা জরুরি। সারা বছর প্রতি মাসে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১০০টি কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, আগামী সপ্তাহে ডিএসসিসি প্রশাসকের মাধ্যমে গুলিস্তান এলাকায় একটি স্থায়ী স্টল উদ্বোধন করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন বয়সি শিশু ও পথশিশুদের জন্য ছোট লাইব্রেরি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেখানে গল্পের বইসহ বিভিন্ন বই পড়ার সুযোগ পাবে তারা। শিশুদের চিন্তা ও চেতনার বিকাশে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি এ উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের আহারের ব্যবস্থাও করা হবে। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে অভিনন্দন জানান তিনি।
