মানিকগঞ্জে রাতের আঁধারে সরকারি রাস্তা কেটে ফেলার অভিযোগ

সাইফুল ইসলাম :মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চালা ইউনিয়নের উত্তর চাঁনপুর এলাকায় সরকারি বরাদ্দে নির্মাণ করা একটি রাস্তা রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, দুর্বৃত্তরা প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট রাস্তা কেটে দেওয়ায় চার-পাঁচ হাজার মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তবে কারা রাস্তা কেটেছে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি স্থানীয়রা।

রাস্তার অবস্থান নিয়ে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। রাস্তা কাটার ঘটনার পর উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কারা রাস্তা কেটেছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

রাস্তা কেটে দেওয়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগীসহ সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। কৃষিপণ্য হাটে নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা ও চিকিৎসাসেবায় যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-খাদ্যশস্য) কর্মসূচির আওতায় উত্তর চাঁনপুর ঈদগাহ মাঠ থেকে কল্যাণপুর আলেকর বাড়ির নদীর পাড় পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য ৯ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৩ নম্বর চালা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি করা হয় ইউপি সদস্য আব্দুল গফফারকে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে তারা সম্মিলিতভাবে রাস্তা নির্মাণের জন্য আবেদন করেন। পরে সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার পর কাজ শুরু হলে স্থানীয় কয়েকজন রাস্তার জন্য নিজেদের জমিও ছেড়ে দেন। তবে কাজ চলার একপর্যায়ে রাস্তার অবস্থান নিয়ে জমির মালিকদের একটি পক্ষের সঙ্গে স্থানীয়দের বিরোধ দেখা দেয়। এর মধ্যেই এক রাতে ভেকু দিয়ে রাস্তার প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট অংশ কেটে ফেলা হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দা আইয়ুব আলী অভিযোগ করেন, রাস্তা নির্মাণের আগে জমির মালিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা করা হয়নি। বরং প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি লোকজন নিয়ে এসে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের সরিয়ে দেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী মুন্নি আক্তার বলেন, রাস্তা কেটে দেওয়ার পর চার গ্রামের মানুষের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য হাটে নেওয়া যাচ্ছে না। শিশুদের স্কুলে পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ অসুস্থ হলে ভ্যান-রিকশা তো দূরের কথা, অ্যাম্বুলেন্সও যেতে পারে না। কয়েক দিন আগে এক অসুস্থ নারীকে রাতে কাঁধে করে নিয়ে যেতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাস্তার অবস্থান নিয়ে বিরোধের বিষয়ে জমির মালিক পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমজাদ হোসেন বলেন, রাস্তার জন্য তাঁর জমির মাঝখান দিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে তাঁর আপত্তি রয়েছে। তিনি রাস্তা কিছুটা ঘুরিয়ে জমির এক পাশ দিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রয়োজনে তিনি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার কথাও বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে এলাকাবাসী রাস্তা নির্ধারিত জায়গা দিয়েই নিতে চান।

অন্যদিকে এলাকাবাসীর দাবি, রাস্তা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের চলাচলে সমস্যা হবে। তাই সরকারি প্রকল্পে নির্ধারিত পথেই রাস্তার কাজ শেষ করা প্রয়োজন।

চালা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল গফফার বলেন, উত্তর চাঁনপুর থেকে আলেকর বাড়ি পর্যন্ত নদীর পাড় দিয়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ ফুট রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) সঙ্গে নিয়ে তিনি এলাকাটি পরিদর্শনও করেছেন।

আব্দুল গফফার বলেন, “কাজ চলমান থাকা অবস্থায় রাস্তা ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগের কিছু কাজও ছিল। সব মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার ফুটের মতো কাজ হয়ে যায়। এর মধ্যে এক রাতে দুর্বৃত্তরা ভেকু দিয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট রাস্তা কেটে দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “কারা রাস্তা কেটেছে, তা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। তবে রাস্তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে এবং তারা একে অপরকে দায়ী করছে। রাস্তা না থাকায় ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষের কৃষিপণ্য পরিবহনসহ স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।”

আব্দুল গফফারের ভাষ্য, এলাকাবাসী বিষয়টি সংসদ সদস্যের কাছে জানানোর পর ৯ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি নিয়ম মেনেই রাস্তার কাজ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

রাস্তা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ স্থানীয়দের সঙ্গে বসে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে আব্দুল গফফার বলেন, এলাকার মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে রাস্তার কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে স্থানীয়রা দ্রুত রাস্তা পুনর্নির্মাণ করে চার-পাঁচ হাজার মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দে নির্মাণাধীন রাস্তা রাতের আঁধারে কেটে দেওয়ার ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

এ বিষয়ে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা আক্তারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Exit mobile version