সাইফুল ইসলাম : সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) অর্থায়নে পরিচালিত মানিকগঞ্জের আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্য গ্রানাডা একাডেমিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহারে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হেমায়েত ফেরদৌসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে।
মানিকগঞ্জ পৌরসভার নয়াকান্দি এলাকায় ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দ্য গ্রানাডা একাডেমি। প্রতিষ্ঠানটির জন্য আড়াই একর জমি এবং বৃদ্ধাশ্রমের জন্য নির্মিত একটি ভবন দান করেন মানিকগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র রমজান আলী। ২০২০ সালে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ৬২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৪৩ জন।
সম্পূর্ণ আবাসিক ও বিনামূল্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার ৩০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শতভাগ পাস করেছে। এর মধ্যে তিনজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সরকারি অনুমোদন বা ইন নম্বর না থাকায় শিক্ষার্থীরা ঘিওর উপজেলার তরা উচ্চবিদ্যালয়ের মাধ্যমে নিবন্ধন করে পরীক্ষায় অংশ নেয়।
প্রতিষ্ঠানটিতে ১৪৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছে ২৩ জন। সে হিসাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত প্রায় ১:৬। এছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা, তত্ত্বাবধায়ক, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও বাবুর্চিসহ মোট জনবল ৪২ জন।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার টাকা। এপ্রিল মাস থেকে তা বাড়িয়ে ১৭ হাজার টাকা করা হয়েছে। এ অর্থ বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখানো হয়। এর মধ্যে টিউশন ফি বাবদ ৬ হাজার ৫০০ টাকা, হোস্টেল ব্যবস্থাপনা বাবদ ২ হাজার ৩০০ টাকা, এনটাইটেল খাতে ১ হাজার ৭০০ টাকা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা বাবদ ৫ হাজার টাকা এবং ইউটিলিটি বিল, শিক্ষা উপকরণ, পরীক্ষা ও অফিস ব্যবস্থাপনা বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়।
সিজেডএমের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দ্য গ্রানাডা একাডেমিতে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯০২ টাকা।
হোস্টেল ব্যবস্থাপনা খাতে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য মাসে ২ হাজার ৩০০ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়। সে হিসাবে ১৪৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক বরাদ্দ দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৯০০ টাকা এবং বছরে প্রায় ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ টাকা।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, হোস্টেল ব্যবস্থাপনায় কর্মরত চারজন হাউজ বেয়ারারের মাসিক বেতন ১৭ হাজার টাকা করে মোট ৬৮ হাজার টাকা।
পোশাক ও অন্যান্য সুবিধা খাতেও অসঙ্গতির অভিযোগ
এনটাইটেলমেন্ট খাতে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য মাসে ১ হাজার ৭০০ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়, যা বছরে ২০ হাজার ৪০০ টাকা। এই অর্থ স্কুল ড্রেস, জুতা, মোজা, ঈদের পোশাক, শীতবস্ত্র, খেলাধুলার পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রীর জন্য ব্যয় দেখানো হয়।
অভিযোগকারীদের মতে, টিউশন ফি খাতেও তুলনামূলক বেশি বরাদ্দ দেখানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকদের বেতন ২২ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে হলেও অধ্যক্ষের মাসিক বেতন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
খাবারের মান নিয়েও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষ্য, সকালে সাধারণত রুটি, ডিম ও ডাল দেওয়া হয়। দুপুরে সপ্তাহে তিন দিন মাছ, তিন দিন মুরগির মাংস এবং এক দিন গরুর মাংস পরিবেশন করা হয়। রাতে ভাতের সঙ্গে বুটের ডাল ও এক গ্লাস দুধ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিকেলে কোনো দিন ছোলা, কোনো দিন সেমাইসহ বিভিন্ন ধরনের নাশতা দেওয়া হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক সময় ভাত ও ডালে ময়লা পাওয়া যায়, দুধ ফেটে যায় এবং দুপুরের বেঁচে যাওয়া ডাল রাতে পরিবেশন করা হয়। এসব কারণে খাবারের মান নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে দ্য গ্রানাডা একাডেমির কো-অর্ডিনেটর শিক্ষক সুশান্ত কুমার পাল ভিন্ন দাবি করেন। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের খাবারের মানের ক্ষেত্রে কখনোই আপস করা হয় না। আমরাও মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই খাবার খাই। রাতে দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও কর্মচারীরাও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুত করা খাবারই গ্রহণ করেন।”
নির্যাতনের অভিযোগ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের
প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, নিয়ম ভঙ্গ করলে তাঁদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয়। অনুমতি ছাড়া বাইরে গেলে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া, গায়ে হাত তোলা এবং পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা যাকাতের টাকায় পড়াশোনার বিষয়টি নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ হেমায়েত ফেরদৌস তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং প্রায়ই চাকরিচ্যুতির ভয় দেখান। সম্প্রতি পুলিশের ভয় দেখিয়ে এক শিক্ষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তিনি মানিকগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
অভিযোগ অস্বীকার অধ্যক্ষের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দ্য গ্রানাডা একাডেমির অধ্যক্ষ হেমায়েত ফেরদৌস বলেন, “কয়েকজন শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। তারাই শিক্ষার্থীদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করাচ্ছেন। অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়মিত অডিট হয়। বরাদ্দের অর্থ নয়-ছয় করার সুযোগ নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই ভিত্তিহীন।”
কী বলছে কতৃপক্ষ
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) চেয়ারম্যান নিয়াজ রহিমের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তাঁর নম্বর থেকে প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চেয়ে একটি খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হয়। জবাবে প্রতিবেদক নিজের পরিচয় জানিয়ে বার্তা পাঠালেও এ বিষয়ে আর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সিজেডএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আইয়ুব মিয়া বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। যাকাত ও অনুদান ফান্ড থেকে শিক্ষার্থীদের অর্থ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা তাদের নামে বরাদ্দ করা ওই অর্থ থেকেই টিউশন ফি, ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, খাবার, পোশাক, হোস্টেল ফি, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ পরিশোধ করে।
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের যে অর্থ দেওয়া হয়, ওই অর্থের মালিক শিক্ষার্থীরাই। তারা বিনামূল্যে লেখাপড়া করে না। তাদের নামে বরাদ্দ করা অর্থ থেকেই তারা টিউশন ফি দেয় এবং সেই টিউশন ফি থেকেই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়। শিক্ষার্থীদের হাতে সরাসরি টাকা তুলে দিলে তারা অপব্যয় করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই অর্থগুলো প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে শিক্ষকদের জিম্মায় রাখা হয়। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে তাদের পক্ষ থেকে ওই অর্থ গ্রহণ করেন।
আইয়ুব মিয়া আরও বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের টাকা দিই। তারা নিজেদের টাকায় খাবার খায়, লেখাপড়া করে এবং প্রয়োজনীয় খরচ পরিশোধ করে। তারা বিনা পয়সায় খায় বা লেখাপড়া করে না।”
শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ প্রসঙ্গে সিজেডএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, কোনো শিক্ষার্থীকে মারধর বা নির্যাতন করার সুযোগ নেই। অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হেমায়েত ফেরদৌসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের কিছু অভিযোগ তারা পেয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
