ইমরান খানের মুক্তি এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু, চাপে পাকিস্তান সরকার

ইমরান খানকে কারাবন্দি রাখা গেলেও তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি, ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তিকে বন্দি রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ তার বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনের ব্যক্তিত্বদের হস্তক্ষেপ সেটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করছে।

সাউথ এশিয়া মনিটরে ৩১ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘ইমরান খান, দ্য ক্রিকেটিং ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড দ্য প্যারাডক্স কনফ্রন্টিং পাকিস্তান’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে লেখক ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক ও আঞ্চলিক-বৈশ্বিক বিষয় বিশ্লেষক রাজু কোর্তি এসব মন্তব্য করেন।

মাইকেল আথারটনের সাক্ষাৎকার থেকে নতুন বিতর্ক

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটন লর্ডসে ইমরান খানের দুই ছেলে সুলেইমান ও কাসিমের সঙ্গে ১৮ মিনিটের একটি সাক্ষাৎকার নেন। সেখানে তারা অভিযোগ করেন, ইমরানকে চরম বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হচ্ছে, তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষ তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করছে। তবে শেষের অভিযোগটি পরিবারের অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) সাক্ষাৎকারটির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং স্কাই স্পোর্টস-এর কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে।

ক্রিকেট কেন ইমরান ইস্যুেক আন্তর্জাতিক করেছে?

ইমরান খান শুধু পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের একজন। ১৯৯২ সালে তার নেতৃত্বেই পাকিস্তান প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে। ফলে তার প্রতি ক্রিকেটবিশ্বের আবেগ রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও বিস্তৃত। আথারটনের মতো একজন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক যখন তার স্বাস্থ্য ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন সেটিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে সহজে উপেক্ষা করা কঠিন।

২২ সাবেক অধিনায়কের আবেদন

২২ জন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কাছে ইমরানের যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তালিকায় ভারতের সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব ও দিলীপ ভেংসরকার, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেগ চ্যাপেল ও ইয়ান চ্যাপেলসহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচিত ব্যক্তিত্বদের নাম রয়েছে। অর্থাৎ ইমরান ইস্যুটি এখন শুধু পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ নয়; ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কও এতে নৈতিক অবস্থান নিতে শুরু করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল ইমরানের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে পাকিস্তানে দেখা ইমরানের তুলনায় বর্তমান ইমরান অনেক দুর্বল। অন্যদিকে পাকিস্তানের সাবেক তারকা জাভেদ মিয়াঁদাদ, যিনি ইমরানের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুমে খেলেছেন, আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটার উসমান খাজাও পিসিবি-এর প্রতিক্রিয়াকে ব্যঙ্গ করেছেন।

এরা রাজনৈতিক কর্মী নন; তারা ইমরানের সাবেক ক্রিকেটীয় সহকর্মী ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। ফলে তাদের বক্তব্যের একটি আলাদা নৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। এভাবে নিবন্ধটিতে ইমরান খানের কারাবাস, তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং ক্রিকেটবিশ্বের প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

আসল ক্ষমতা কোথায়-সরকার, নাকি সামরিক প্রতিষ্ঠান?

ইমরানের কারাবাসকে শুধু শেহবাজ শরিফ সরকার বা কারা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পাকিস্তানের বাস্তব ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি বোঝা যাবে না। ইমরানের রাজনৈতিক আন্দোলন ও পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে তাঁর কারাবাস ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীরভাবে যুক্ত। সামরিক প্রতিষ্ঠান ইমরানকে শুধু একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকাঠামোর জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে-এমন বিশ্লেষণই লেখক উপস্থাপন করেছেন।

ক্রিকেটীয় চাপ কতটা কার্যকর?

তাৎক্ষণিকভাবে খুব বেশি নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বরা পাকিস্তানের ওপর নৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু সেই চাপ সরাসরি পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে চাপটি পুরোপুরি অকার্যকরও নয়। এটি-ইমরান ইস্যুেক আন্তর্জাতিক করে; তার চিকিৎসা ও কারাবাস নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক রেকর্ড তৈরি করে; পাকিস্তান সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়ায়; তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে রাজনৈতিক মূল্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্বাস্থ্য নিয়ে তথ্যের ঘাটতি কেন সমস্যা?

ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে সব অভিযোগকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। সমস্যাটি হলো-ইমরান খান ৭৩ বছর বয়সী, কারাগারে রয়েছেন, তার পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে এবং তার প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। ফলে একটি ইনফরমেশন ভ্যাকুয়াম তৈরি হচ্ছে, যেখানে গুজব ও জল্পনা সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর সমাধান: স্বাধীন চিকিৎসা পরীক্ষা + নিয়মিত স্বাস্থ্য প্রতিবেদন + পরিবার ও আইনজীবীদের পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার + প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিস্থিতির স্বচ্ছ প্রকাশ।

পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় ‘প্যারাডক্স’

ইমরান খানকে বন্দী করে রাখা পাকিস্তানের জন্য সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। কারণ এতে দুটি সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। একদিকে, তাকে দীর্ঘদিন কারাগারে রেখে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে। অন্যদিকে, যদি তার স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয় বা তাঁর প্রতি অন্যায় আচরণের ধারণা আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে তিনি আরও বড় প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। এটাই পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামোর প্যারাডক্স।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সামরিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচিত সরকার, জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনমতের সম্পর্ককে আলাদা করে দেখা যায় না। ইমরান খানের ক্ষেত্রে ক্রিকেট তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে তার ক্রিকেটীয় পরিচিতি আজও তার রাজনৈতিক পরিচয়কে আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে, কোনো জনপ্রিয় নেতাকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক পরিসর থেকে সরিয়ে রাখলে তার জনপ্রিয়তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়-এমন নিশ্চয়তা নেই। কখনো কখনো কারাবাসই একজন নেতাকে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করতে পারে।

ইমরান খানকে কারাগারে রাখা সম্ভব, কিন্তু তার উত্তরাধিকারকে কারাগারে রাখা কঠিন। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে যে ব্যক্তির পরিচিতি পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত, তাঁর কারাবাসের প্রশ্নও শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে পাকিস্তানের জন্য সমস্যাটি এখন শুধু ইমরান খানকে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে-তা নয়; বরং তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তাকে আরও বড় রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা হচ্ছে কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর

Exit mobile version