ডেঙ্গুর চিকিৎসা যেখানে, সেখানেই এডিসের প্রজনন

একদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে যে হাসপাতালে চলছে ডেঙ্গুর চিকিৎসা, সেখানেই দেখা মিলছে মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি, ময়লা-আবর্জনা, পানির ট্যাংকি ও বর্জ্যের স্তূপ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র যেন ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ জন। এর মধ্যে ১৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতাল প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ রয়েছে। কোথাও জমে আছে পানি, কোথাও পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। ফলে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজনন নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, সেই হাসপাতালেই যদি এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ থাকে, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যক্রম কতটা কার্যকর?

তবে এই হিসাব শুধু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। রূপগঞ্জের ২৮টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। গুরুতর অবস্থায় অনেককে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস রূপগঞ্জে। দুটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় বর্ষার পানি বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘসময় ধরে জমে থাকছে।

বাড়ির আঙিনা, ডোবা-নালা, নর্দমা, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, পুরোনো টায়ার কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি হয়ে উঠছে এডিস মশার প্রজননস্থল।

জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা বমি বমি ভাব নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে আসছেন রোগীরা। অনেকেই প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করে বাড়িতে চিকিৎসা নেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

এক রোগী জানান, কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড জ্বরের পাশাপাশি শরীর ও মাথায় ব্যথা এবং মাথা ঘোরার সমস্যা হচ্ছিল। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করলেও পরে হাসপাতালে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হঠাৎ উচ্চ জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, দুর্বলতা এবং বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পানিশূন্যতাও তৈরি হয়। তাই জ্বরকে সাধারণভাবে না নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ইউনিয়ন পর্যায়ে মশক নিধন কোথায়?

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও রূপগঞ্জের সাত ইউনিয়নে মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, পৌরসভা এলাকায় মাঝেমধ্যে মশার ওষুধ ছিটানো হলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। ফলে গ্রামের বিভিন্ন ডোবা-নালা, ময়লার ভাগাড় ও পরিত্যক্ত জায়গায় মশার বিস্তার বাড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম চালাতে হবে।

ডেঙ্গুতে মৃত্যু, বাড়ছে উদ্বেগ

সম্প্রতি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী আবু ছিদ্দিক। তার মৃত্যুর পর স্থানীয়দের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের নাদিম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য রোগ। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দিলে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারবে না।

তিনি বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালের সক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী সামাল দিতে হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকটও রয়েছে। ময়লা অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় হাসপাতালের পেছনের অব্যবহৃত স্থানে বর্জ্য রাখতে হচ্ছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় ইউনিয়ন ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসার চেয়ে জরুরি প্রতিরোধ

ডেঙ্গু মোকাবিলায় রোগী হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে।

কারণ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও যদি জমে থাকা পানি ও বর্জ্য থেকে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি কতটা নিরাপদ, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে কিংবা ডেঙ্গু পরীক্ষা করেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত মশক নিধন, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, জমে থাকা পানি পরিষ্কার এবং প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে কার্যকর নজরদারি।

রূপগঞ্জে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার প্রস্তুতি নেওয়া হবে, নাকি তার আগেই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করে রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

Exit mobile version