প্রায় নিশ্চিত যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলের আসনে জামায়াতে ইসলামী দেখা যাবে না। যদিও দলটির নেত্রীরা সরকার গঠনের আশাবাদ প্রকাশ করেছেন, তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলছে এবারে বিএনপির প্রভাবই বেশি হবে। এই কারণে ক্ষমতাসীন হতে বিএনপির সঙ্গে আসন সন্ধানের বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহ তীব্র। আওয়ামী লীগও সেই সুযোগটি নিজেদের লাভজনকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। যদিও তারা দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না, তথাপি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিরোধী শিবিরে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াত।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আসন নয় শুধু, বরং বিএনপি কর্তৃক ঘোষিত জাতীয় সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রিসভাতে অংশ নিতে উদগ্রিব জামায়াতে ইসলামী। বিভিন্ন সংগঠনগত বিষয় ও অন্যান্য কারণে তারা কোনমতেই আগামী সংসদে বিরোধী দলে থাকতে চাইছেনা। গত পনেরো বছরের ক্ষমতা-অভিজ্ঞতার মধ্যে মামলা, হামলা এবং আর্থিক ক্ষতির অভিজ্ঞতা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তারা।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ যদিও দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তবে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অন্তত ৬০টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব আসনের মধ্যে কিছু এমন জায়গা রয়েছে যেখানে আওয়ামী লীগের ‘রিজার্ভ ভোট’ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব আসনে সংখ্যালঘু ভোট ১৮% থেকে ২২% পর্যন্ত—এসব আসনগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশ ও ভারত থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী টিম এই বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
এ টিমের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন যে ১০ থেকে ১৫টি আসনে তারা নিশ্চিত জয় পাবে। তাছাড়া আরও কমপক্ষে ৪০টি আসনে অল্প ব্যবধানে বিজয়ের সম্ভাবনা সূত্রপাত করেছে।
তাদের ধারণা হলো,সর্বনিম্ন ৩৫ এবং সর্বোচ্চ ৬0 টি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয় লাভ করতে পারে। ফলে, নির্বাচনের ফলাফলে দলটির বিরোধী দিকে যাওয়ার সম্ভবনার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া সমর্থ নয়।
অন্যদিকে জামায়াত মনে করছে, যদি তাদের মোট আসন সংখ্যা কমে যায় এবং তারা বিরোধী দলে চলে যায় তাহলে তাদের দলীয় অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বিএনপির সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছালে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং সাংগঠনিক দৃঢ়তা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া মন্ত্রিসভায় শামিল হলে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জন্যও কার্যকর অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হবে।
জামায়াতের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিরোধী দলে অবস্থান করলেই সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে জনস্বার্থে আলোচনা করতে হয়। এর মানে হলো, যদি জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং সংসদে সরকারি দলের বাইরেও থাকে, তবে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। কারণ সংসদে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র এমপিরাও সরকারের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলতে পারে। এ ক্ষেত্রে জামায়াত ও আওয়ামী লীগকে বিএনপির বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হতে পারে। যদি এমনটা ঘটে, তাহলে তা আত্মহননের মত ‘ট্র্যাজিক পলিটিক্স’ হিসেবে গণ্য হবে যা জামায়াতের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
যদিও ১৯৯৬ সালে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিএনপি সরকারের বিপক্ষে আন্দোলন করেছে, মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি আগেই সামনে এনেছিল জামায়াতে ইসলামী। আবার ভবিষ্যতে একইভাবে আওয়ামী লীগের সাথে যুদ্ধে নামলে বিএনপির বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কী দাঁড়াবে সেটা ভাবনার বিষয়। তবে রাজনীতিতে কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়; এখানে স্বার্থের জন্য আত্মীয়তার বাঁধনও ছিন্ন হয় না। এই প্রসঙ্গে মন্তব্য চাইলে জামায়াতের নেতারা অনেকটাই কৌশলী উত্তর দেন।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানিয়েছেন, জাতীয় পার্টি ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। তারা দেশের গণতন্ত্রের ধ্বংসে সমান দায়ী। জনসাধারণ আর জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে দেখতে চায় না। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে বিপুল সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়ে ৪০-৫০টি আসনে জয়লাভ করবে বলছেন, তাদের আশা পূরণ হবে না। কারণ বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত সচেতন এবং যতই অজানা হোক—ছদ্মবেশী আওয়ামী লীগারদের সনাক্ত করতে তারা ভুল করবেনা। জনগণ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবে।
এদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, এসব কথাগুলো কিছু লোকের মনে ভালো লাগতে পারে, যারা ক্ষমতা নিশ্চিত করেছেন তাদের জন্য এটা উপযুক্ত কথা হতে পারে। জামায়াত কেন বিরোধী দলে যাবে? ইনশাআল্লাহ, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করবে। আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সম্ভাব্য বিজয়ের সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করে তিনি মন্তব্য করেন যে বর্ণচোরা আওয়ামী লীগারদের চিনতে মানুষ কোনো ভুল করবে না এবং তারা জনসমক্ষে উপস্থিত হতে পারবেনা।
