ইউনুস সরকার হটানোর পরিকল্পনা নিয়ে হাসিনা-পুতুল তর্কাতর্কি

দিল্লির শেখ হাসিনার গোপন স্থাপনাতেই চলছে নাশকতামূলক প্রস্তুতির কার্যক্রম। তবে, ৪ নভেম্বর মা শেখ হাসিনা ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মধ্যে আন্দোলনের কৌশল নিয়ে কথপোকথন হয়। পুতুল তার মাকে এই মুহূর্তে চুপ থাকার আবেদন জানানোর পর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে যান, এমনটাই দাবি করেছেন ঢাকার নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো, যারা হাসিনার প্রতি নজরদারি করছেন।
বিশ্বস্ত তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির লুটিয়েন্স বাংলো জোনে ভারত সরকারের প্রদত্ত একটি সুরক্ষিত আবাসনে বর্তমানে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া শাখার প্রধান পদ হারানোর পরে প্রায় সব সময় তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ সেখানে বাস্তবে একটি ‘যুদ্ধ কক্ষ’ হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা রেখেছে। নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চিকিৎসক ও নার্সগুলি উপস্থিত থাকেন এবং বড় কোনো অসুস্থতা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ডাকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া ওই অবস্থিতিতে ভারতে কর্মরত একজন সাবেক হাইকমিশনারও রয়েছেন এবং ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নির্বাচিত আইনজীবী আইনি বিষয়গুলোর তদারকি করেন, পাশাপাশি গণমাধ্যম সম্পর্কিত বিষয়ে সহায়তা প্রদান করেন এক সাংবাদিকও। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের প্রশ্নাবলীর ওপর নজর রাখছেন তাঁরা বলে জানা গেছে।
সূত্র মতে, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার কৌশল নিয়ে আলোচনা করে এবং দ্রুত সাফল্য অর্জনের জন্য প্রস্তুতি শেষে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল মাকে ওই উদ্যোগ বন্ধ করতে বললে হাসিনা ধৈর্য হারান। অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগের পালিয়ে থাকা শীর্ষ নেতারা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের রাজধানী দিল্লিকে তাদের প্রধান পরিকল্পনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। এখান থেকে তারা দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও নাশকতার মাধ্যমে সরকারের পতনের জন্য চক্রান্ত পরিচালনা করছেন। বিশেষত দলের পালাতক নেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা মামলার রায় ঘোষণার সম্ভাব্য তারিখ ১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে নাশকতার পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পরে রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৩৭ জন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবর শেখ হাসিনার দিল্লির বাসভবনে সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রাক্তন মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে একটি গোপন উচ্চপর্যায় বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে যে, ওই দিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত চার ঘণ্টাব্যাপী এই একান্ত সাক্ষাতে আওয়ামী লীগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ১০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—ডিজিএফআইয়ের পূর্ববর্তী ডিজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রাক্তন কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
সাভার স্থানের প্রাক্তন এমপি সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের প্রাক্তন আহ্বায়ক ও এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চু, কক্সবাজারের সাবেক এমপি ও হুইপ সাইমুম সরোয়ার কমল, ফরিদপুরের সাজেদা চৌধুরীর পুত্র আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু এবং টাঙ্গাইলের প্রাক্তন এমপি ছোট মনির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
এই সভায় মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়—প্রথমে, সাম্প্রতিক ‘গুম প্রসিকিউশন চার্জে’ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ। দ্বিতীয়ত, আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আইনশৃঙ্খলা অবনতির লক্ষ্যে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া এবং বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন বাড়ানোর পরিকল্পনা। তৃতীয়ত, দলের সংগঠন শক্তিশালী করা এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে ঢাকা ও আশেপাশের এলাকা এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ বিভাগীয় শহরে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে কারা ছিলেন তা নিয়েও পুতুল মা প্রশ্ন করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ হলো যে এই ব্যক্তিদের কারণে হাসিনার বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে; অন্যদিকে হাসিনার বক্তব্য হচ্ছে তাঁদের মাধ্যমেই পরিস্থিতি বদলাতে হবে।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবির আহমেদের নাম প্রকাশ পাওয়ার পর ৯ অক্টোবর রাতে শেখ হাসিনা নির্দেশ দেওয়ায় তিনি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান।
অর্থ জোগান ও নেতাকর্মীদের অসন্তোষ
নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ সংগ্রহ নিয়ে পলাতক নেতাদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ প্রকাশিত হয়েছে। সূত্র মতে, ১৩ নভেম্বরের প্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন জেলা কমিটির নির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে গত শুক্রবার রাতে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা অনলাইনে আলোচনা করেন। এতে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা ছিলেন— কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম, গাজীপুরের পূর্ববর্তী মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং ক্যাসিনো সম্রাট হিসেবে পরিচিত যুবলীগের প্রাক্তন নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে প্রতিটি উপজেলা থেকে অন্তত ২০০ জন করে কর্মী ঢাকায় জমায়েত করবে।
ইতোমধ্যে ঢাকা এবং আশপাশের থানা এলাকাগুলোতে (বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, দোহার, নবাবগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলার সাইনবোর্ড ও চাষাঢ়া) তাদের একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থ সাহায্য প্রদান সম্পর্কে কিছু নেতার মধ্যে হতাশা আছে বলে শোনা যাচ্ছে; তারা স্বেচ্ছায় টাকা খরচে আগ্রহী নন বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের বক্তব্য হলো—অনেক অরাজনৈতিক ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন এবং অনেকেই ব্যবসায়ীদের চরিত্র ধারণ করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেছেন। তাই বৃহৎ ব্যবসায়িক দলের কাছ থেকে ফান্ড গ্রহণ করা আবশ্যক বলেও মনে করেন তারা।
আলোচনার মধ্যে উঠে আসে যে, শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সিকদার গ্রুপ ইতোমধ্যে সরকারকে উৎখাত করতে ছয় কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে, নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পায় যখন জানা যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আবেগী কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা শহরে গুলির সম্মুখে মিছিল করছেন, অথচ তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে মাত্র দুই হাজার বা পাঁচ হাজার টাকা, যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এই পরিস্থিতিতে অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি নেতাদের আলোচনা বিষয়ে স্থান পায়।
নাশকতার ব্লুপ্রিন্ট ও ককটেল হামলা
সূত্র জানায়, সরকারের পতন ঘটাতে নাশকতার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এড়িয়ে বোমা এবং ককটেলবাজি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কিছু লক্ষণও দেখা গেছে। গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর কাকরাইলের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের চার্চের (গির্জা) গেটে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পুলিশ জানায়, কিছুটা নিরিবিলি এলাকায় গভীর রাতে মোটরসাইকেল থেকে ককটেল নিক্ষেপ করে মূলত নিজেদের জানান দেওয়া এবং জনমনে ভীতি ছড়ানোর কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিতভাবে এভাবে বোমাবাজি এবং ককটেল নিক্ষেপ করা হবে বলে পরিকল্পনা নিয়েছে পলাতক ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ।
এর আগে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ঢাকায় নাশকতার পরিকল্পনার মূল সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভারতে পলাতক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে। তাকে কৌশলগত সব সহযোগিতা দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এসবির সাবেক প্রধান ভারতে পলাতক পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মনিরুল ইসলাম এবং ডিএমপির পলাতক কমিশনার হাবিবুর রহমানকে। এসএসএফের সাবেক ডিজি ও সাবেক কিউএমজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মুজিবুর রহমান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেনসহ একাধিক সেনা কর্মকর্তা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাকায় অস্থিরতা তৈরির মিশন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে পলাতক সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি লিয়াকত শিকদার, গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ওরফে ক্যাসিনো সম্রাট। এ নাশকতার অংশ হিসেবে আদালতপাড়া ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় বোমাবাজির টার্গেট করা হয়েছে এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। সরকার পতনের লক্ষ্যে নেওয়া নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বাছাইকৃত নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনা শুরু হয়েছে এবং ওই দিন ঢাকায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটাতে চায় ষড়যন্ত্রকারীরা। এর মধ্যে সশস্ত্র ক্যাডাররা অস্ত্রবাজি করতে পারে বলে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে।
আরো জানা গেছে, নভেম্বরের মধ্যেই যদি হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলার রায় হয়ে যায়, তাহলে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার ছক তৈরি করা হয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে মাঠপর্যায়ে এখনই সেনা মোতায়েন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান
অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অভিযান জোরদার করেছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানী ও আশপাশের থানাগুলোয় অভিযান চালিয়ে অন্তত ৩৭ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। এছাড়া ঢাকা জেলা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ সাঁড়াশি অভিযান পলাতক নেতৃত্বের নাশকতার পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। নিয়মিত অভিযানে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হচ্ছেন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী যদি দেশে আবার বিশৃঙ্খলা বা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করে, তাহলে জনগণই তাদের প্রতিরোধ করবে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ সরকার পালিয়ে গেছে। দেশ ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে এবং করে চলেছে।





