ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ চায় ভারত

অন্তর্বর্তী সরকারকে বার্তা ভারতের

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ চায় ভারত : বাংলাদেশের মতোই দুটি দেশে ‘জেন জি’ নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটিয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকেও এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এছাড়া, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকার কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। 

এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনও প্রতিযোগিতার সুযোগ নেই। কিন্তু ভারত এখনও পুরোপুরি হাল ছাড়েনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ এবং ‘গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন নিশ্চিত করতে, এমনকি প্রতীকীভাবে হলেও আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশ নিতে দেওয়ার পক্ষে ভারত তার অবস্থান রাখছে— যা তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সম্প্রতি পরিষ্কার করে জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে শ্রীলঙ্কা ও নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলীর উল্লেখ এসেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ‘জুলাই গণহত্যায়’ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সমস্ত রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করছে যে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলটি নির্বাচনে লড়তে পারবে না, তাদের এতে কোনও ভূমিকা নেই।

এদিকে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের স্থির অবস্থান হলো— সুষ্ঠু ও অবাধ ছাড়া এটি অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, ভারত চায় ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেন কোনো ভাবে লড়ার সুযোগ পায়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চলতি সপ্তাহে এনডিটিভিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন। ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে তিনি বল প্রয়াস করেন, ‘আমরা যা শুনেছি তা হলো, বাংলাদেশের জনগণের, বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মধ্যে পূর্ববর্তী নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষ ছিল। তবে এটি আমাদের সমস্যা নয়; আমরা তাদের একজন সদাচারী প্রতিবেশী– এটাই মেনে নিতে হবে। কিন্তু যদি নির্বাচনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। ’

তিনি আরও জানান যে, তারা আশা করছেন আগামীতে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেহেতু এটি তাদের দায়িত্বের অংশ। তবে শেষ পর্যন্ত যদি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ওপর কোন বাধা থাকে, তাহলে সেটি সম্পন্ন করাটাই সবচেয়ে জরুরি। ’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন পুরোপুরি নিরপেক্ষ এবং মুক্ত হতে হবে– ভারত এই বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নয়। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারে, তাহলে ভারতের কাছে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না– এমনটি তিনি নিষ অপ্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ করেছেন।

শ্রীলঙ্কা ও নেপাল কেন উল্লেখ করা হচ্ছে?

ভারতের নীতি নির্মাতা ও শীর্ষ কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগকে কেন অতীতে শ্রীলঙ্কা ও নেপালের উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তা হলো ২০২২ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ উঠেছিল যুবকদের দ্বারা। তখন আন্দোলনকারীরা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ দখলে নিয়েছিলেন এবং ওই সময় জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন রাজাপাকসে সহ তার অনেক মন্ত্রীও। কিন্তু দুই বছর পরে যখন সেখানে পার্লামেন্টারি নির্বাচন হয়, তখন রাজাপাকসের দল (শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরুমান) ভোট করার সুযোগ পেয়েছিল। যদিও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি তারপরও দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের পথে রয়েছে শ্রীলঙ্কা।

এছাড়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে জেন জির প্রতিবাদজনিত কারণে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার পর, প্রধানমন্ত্রী ওলি এবং তার বেশ কয়েকজন মন্ত্রী প্রাণভয়ে আত্মগোপনে যান। এর পরে দেশের অন্তর্বর্তী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি। তিনি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। পূর্ববর্তী সরকারের দল, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল– ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট, নির্বাচন থেকে বাদ পড়বে না; বরং তারা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। ফলে ধীরে ধীরে নেপালের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দুটি দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে ভারত বলছে যে বাংলাদেশেও শান্তি, উন্নয়ন ও ঐক্যের স্বার্থে সকল মূল রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া উচিত। যদি না করা হয়, তবে শেখ হাসিনার সময়ে হওয়া বিতর্কিত নির্বাচনের কৌশল পুনরাবৃত্তির দোষ অন্তর্বর্তী সরকারকেও বহন করতে হতে পারে।

তবে ভারতের এ পরামর্শ বাংলাদেশের দ্বারা কতটা গৃহীত হবে এবং আওয়ামী লীগকে কোনোভাবে ভোটের পরিবেশে আনতে দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রইেছে। যদিও দিল্লির আশা যে এই জটিলতার সমাধান এখনও খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

Exit mobile version