জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য নাম আল আজহার শরীফ। এক সহস্রাধিক বছরের পথচলা পেরিয়ে আজ ১০৮৬ বছর উদযাপন করছে এই মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠান যার দেয়াল, মিনার ও মার্বেল স্তম্ভে খোদাই হয়ে আছে সময়ের দীর্ঘ স্বাক্ষর।
মিশরের রাজধানী কায়রো প্রতিষ্ঠার এক বছর পরই সূচনা হয় আল আজহারের নির্মাণকাজ। ৩৫৯ হিজরিতে শুরু হয়ে ২৭ মাসের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম শেষে ৩৬১ হিজরির ৭ রমজান, খ্রিস্টীয় ৯৭২ সালের ২১ জুন, শুক্রবার প্রথমবারের মতো এখানে জামাতে নামাজ আদায় করা হয়। সেই ঐতিহাসিক দিন থেকে শুরু হয় এক আলোকযাত্রা যা আজও অব্যাহত।
ফাতেমীয় খিলাফতের আমলে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদ পরবর্তীতে কেবল ইবাদতের স্থান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী ইসলামি বিদ্যাপীঠে। যুগে যুগে শাসক ও আলেমদের পৃষ্ঠপোষকতায় আল আজহার হয়ে ওঠে কুরআন-হাদিস, ফিকহ, তাফসির, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব ও বিজ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র। ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে এটি টিকে থেকেছে জ্ঞান ও মধ্যপন্থী ইসলামের প্রতীক হিসেবে।
মামলুক, উসমানি এবং আধুনিক মিশরীয় আমলেও এর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ অব্যাহত ছিল। প্রতিটি যুগই যুক্ত করেছে নতুন স্থাপত্যরূপ, নতুন মিনার, নতুন শিক্ষাপদ্ধতি। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয় ১৪৩৯ হিজরি, অর্থাৎ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে যেখানে ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক সংরক্ষণকৌশল প্রয়োগ করা হয়।
বর্তমানে আল আজহার মসজিদে রয়েছে ৬টি মিহরাব, ১টি ঐতিহাসিক মিম্বর, ৮টি প্রবেশদ্বার ও ৫টি সুউচ্চ মিনার। প্রায় ১২ হাজার বর্গমিটার বিস্তৃত এই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছে ৩৮০টিরও বেশি মার্বেল স্তম্ভ যেগুলো বিভিন্ন যুগের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন বহন করে। প্রতিটি স্তম্ভ যেন ইতিহাসের নীরব ভাষ্যকার, প্রতিটি মিনার যেন আকাশের দিকে প্রসারিত প্রার্থনার প্রতীক।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আল আজহার শুধু মিশরের নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আস্থার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এখান থেকে শিক্ষালাভ করেছেন অসংখ্য আলেম, চিন্তাবিদ ও সংস্কারক যারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জ্ঞান ও দাওয়াহর আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
আজ যখন বিশ্ব নানা মতাদর্শিক বিভাজন ও চরমপন্থার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন আল আজহার তার মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামি চিন্তার এক সুদৃঢ় ভিত্তি হিসেবে অবস্থান করছে। এর শিক্ষা-দর্শন সহনশীলতা, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়—যা আধুনিক বিশ্বে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
১০৮৬ বছরের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিকী নয়, এটি এক অবিচ্ছিন্ন জ্ঞানধারার উদযাপন। আল আজহার শরীফ প্রমাণ করেছে সময় বদলায়, সাম্রাজ্য বিলীন হয়, কিন্তু জ্ঞানের আলো কখনো নিভে যায় না।
