
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী হিসেবে মো. কাবির মিয়াকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এক ব্যক্তিকে ‘ট্রাক’ প্রতীকের টিকিট দেওয়ায় ভিপি নুরের দলের রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে ঋণখেলাপির দায়ে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপন্থী একটি দলের এমন সিদ্ধান্তকে ‘আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. কাবির মিয়া আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য এবং গোপালগঞ্জ জেলা তাঁতী লীগের সভাপতি। গত বছর জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে হত্যাচেষ্টা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তিনি গত এপ্রিল মাস থেকে কারাগারে রয়েছেন। এমনকি ২০২৪ সালের আলোচিত ‘ডামী নির্বাচনে’ ঈগল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই নেতা ভিডিও বার্তায় নিজেকে ‘আজন্ম বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে দাবি করেছিলেন। এমন একজন কট্টর আওয়ামী লীগ নেতাকে গণঅধিকার পরিষদ মনোনয়ন দেওয়ায় গোপালগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
কাবির মিয়ার বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানা, মোহাম্মদপুর ও আশুলিয়া থানায় একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলো— এমন প্রশ্নে গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) হাসান আল মামুন জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে তথ্য ছিল কাবির মিয়া অনেক আগেই আওয়ামী লীগ থেকে সরে এসেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় তাঁরা পুনরায় তদন্ত করবেন এবং প্রয়োজনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কাবির মিয়ার বর্তমান পদ-পদবি সম্পর্কে তাঁরা আগে অবগত ছিলেন না। এ বিষয়ে কাবির মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলেও, কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
গোপালগঞ্জ-১ আসনের অন্যান্য প্রার্থীরা নুরুল হক নুর ও তাঁর দলের এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ ও ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মুকসুদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম খান এবং জেলা জামায়াত নেতা রেজাউল করিম মোল্লা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ না করেই অন্য দলের ব্যানারে নির্বাচন করা মূলত দলটিকে পুনর্বাসনের একটি অপচেষ্টা। সাধারণ মানুষের মতে, সুযোগ বুঝে রং বদলানো এমন নেতাদের প্রশ্রয় দেওয়া জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী।
গোপালগঞ্জ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আরিফ উজ্জামান জানিয়েছেন, ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে কাবির মিয়ার মনোনয়নপত্র প্রাথমিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। তবে তিনি চাইলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসনে বর্তমানে বিএনপি, জামায়াত ও এবি পার্টিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা বৈধ হিসেবে টিকে আছেন।
জাতীয় পার্টিকে ‘ফ্যাসিবাদ ও আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে রাজপথে লড়াই করা গণঅধিকার পরিষদ এখন নিজ দলের প্রার্থীর কারণে বড় ধরনের ইমেজ সংকটে পড়েছে। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনের মধ্যে দলটি কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।





