জাতীয়বাংলাদেশ

হাট ভরা গরু থাকলেও নেই ক্রেতা, দুশ্চিন্তায় খামারিরা

কোরবানির ঈদ আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, অথচ যশোরের শার্শা উপজেলায় এখনও জমে ওঠেনি পশুর হাটগুলো। হাটভর্তি কোরবানির পশু থাকলেও ক্রেতার দেখা পাচ্ছেন না হাটে আসা স্থানীয় কৃষক ও খামারিরা। চাহিদার তুলনায় বেশি পশু প্রস্তুত হওয়ায় ইতোমধ্যে গরু ও ছাগলের বাজারে দামের কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এতে ক্রেতারা সন্তুষ্ট হলেও উদ্বেগে পড়েছেন খামারি ও কৃষকরা।

হাট ঘুরে জানা গেছে, যশোরের শার্শার কোরবানির পশুর হাটগুলোতে পর্যাপ্ত পশু থাকলেও বিক্রি হচ্ছে কম। এবার দাম নিয়ে ক্রেতাদের তেমন কোনও অভিযোগ নেই। মোটামুটি দামের মধ্যেই রয়েছে কোরবানির গরু।

প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্র জানায়, উপজেলায় এ বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১৬ হাজার গবাদিপশু। যার মধ্যে গরু ১৩ হাজার ১০০টি, ছাগল দুই হাজার ৩০০টি ও মহিষ ৯৫০ টি। যদিও চাহিদা রয়েছে ১৩ হাজার ৫২৬টি পশুর।

সূত্র জানায়, উপজেলায় ছোট-বড় মিলে এক হাজার ১৩১টি পশু খামার রয়েছে। এর মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করা বড় খামার রয়েছে ১৫টি। অন্যগুলো কৃষক পর্যায়ের খামার। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে শার্শার সাতমাইল পশুর হাটে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ বিভিন্ন ধরনের পশু বেচাকেনা হচ্ছে। ভারতীয় গরু না এলেও দেশে কোরবানির পশুর কোনও ঘাটতি নেই। দামও তুলনামূলকভাবে কম। দেশি গরু কিনতে পেরে ক্রেতারা অনেক খুশি।

এদিকে খামারিরা বলছেন, সামনের কয়দিনে ভারতীয় গরু না এলে এ বছর তারা ভালো দামে গরু বিক্রি করতে পারবেন বলে তাদের ধারণা। তবে বর্তমানে গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

এবার যশোর জেলার শার্শা উপজেলায় স্থায়ীভাবে মাত্র দুটি পশুরহাট বসেছে। এসব হাটে স্থানীয় কৃষক ও খামারিদের পালিত গরুই বেশি উঠেছে। তবে মাঠে ধান কাটার মৌসুম থাকার কারণে অধিকাংশ মানুষ এখন ধান তোলায় সময় দিচ্ছেন। এ কারণে কোরবানির গরু বেচাকেনা জমে ওঠেনি। এদিকে পশু হাটে বিক্রি না বাড়ায় খামারি ও কোরবানি গরু পালনকারীরা রয়েছেন দুশ্চিন্তায়।

তারা মনে করছেন, কোরবানির গরু এবার কম দামে বিক্রি করতে হবে। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, দেশে বর্তমানে ইরি ধান সংগ্রহের মৌসুম চলছে। ধান এখনও পুরোপুরি মানুষ মাড়াই করতে পারেনি। হাটে যে গরু ৫০-৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা, সে গরু এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫৫ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া সম্প্রতি বন্যা এবং ধান কাটার প্রভাবে মানুষের মধ্যে নেই ঈদ ভাবনা।

যশোরের শার্শা উপজেলার সাতমাইল পশুরহাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় গরু ও ছাগলে ভরে উঠেছে হাট। কিন্তু হাটে পশু থাকলেও নেই ক্রেতাদের ভিড়। কয়েকজন আসছেন, দাম করছেন আবার চলে যাচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষক ও খামারিরা জানান, চলতি মৌসুমে মাঠে ধান কাটা শুরু হওয়ায় যশোরের শার্শার সাতমাইল ও নাভারণ পশুর হাট জমে ওঠেনি। অন্য বছর এইসব হাটে ক্রেতাদের ঢল নামতো। এই বছর ক্রেতার দেখা মিলছে না। যাও দুয়েকজন আসছেন তাদের সঙ্গে দামে মিলছে না। এখন গরু বিক্রি করতে পারবো কি না সেটা নিয়েও চরম দুশ্চিন্তায় আছি।

যশোরের সবচেয়ে বড় গরু খামার ব্যবসায়ী শার্শা উপজেলার পুটখালি ইউনিয়নের গরু খামার ব্যবসায়ী নাসির উদ্দীন। তিনি জানান, এবার তার খামারে ৩০০’র বেশি উন্নত জাতের ষাঁড় লালন-পালন করেছেন। এছাড়া ৫টি উটও আছে। যার দাম প্রতিটি ২৫ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রতিটি গরুর ওজন ৫০০ থেকে ১২০০ কেজির ওপরে। ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা দামে গরুও আছে। সবুজ ঘাস, ভুট্টা ও গমের ভুসি খাইয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে গরুগুলো মোটাতাজা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, গত বছর কোরবানির ঈদের আগে শেষ সময়ে হাটে ক্রেতা কম ছিল। এতে কম লাভে বাধ্য হয়ে গরু বিক্রি করতে হয়েছিল। তবে এবারও মোটামুটি ভালো দাম পাব আশা করছি।

শার্শার ধলদা গ্রামের হাসেম আলী জানান, এবার ১০ টি গরু কোরবানির হাটে তোলার জন্য প্রস্তুত করেছেন। তিনি বলেন, গত বছর অনেক গরু অবিক্রিত ছিল। কেউ কেউ কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ছোট খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাননি।

তিনি আরও বলেন, “খড়, ভুসি, ভুট্টা, ওষুধ ও পরিবহন ব্যয় কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় গরুর দাম বাড়েনি। এতে ক্ষুদ্র খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শার্শার সাতমাইল হাটে গরু নিয়ে আসা আসাদুজ্জামান বলেন, অনেক কষ্ট করে শার্শার পশুর হাটে গরু নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখনও গরু বিক্রি করতে পারেনি। এক লাখ টাকার গরু মাত্র ৭৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা দাম হাঁকাচ্ছে। এই হাটে দুই থেকে তিন লাখের ওপরে গরু পাওয়া যাচ্ছে।

শার্শার সাতমাইল পশুর হাটের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, হাটে পর্যাপ্ত পরিমাণে পশু থাকলেও ক্রেতার দেখা মিলছে না। সেই জন্য তাদের বড় অঙ্কের লোকসান হতে পারে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতাদের আসার আহ্বান জানান তিনি। সাতমাইল পশুর হাটে গরু প্রতি ৬০০ টাকা পাস থাকলেও আমরা নিচ্ছি ৫০০ টাকা।

শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তপু কুমার সাহা বলেন, যশোরের শার্শা উপজেলায় দুটি পশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে শার্শা উপজেলার সাতমাইল এবং নাভারন পশুর হাট। এর বাইরেও ঈদকে সামনে রেখে উপজেলার বিভিন্ন খামার থেকেও ক্রেতারা গরু ক্রয় কিনছেন। খামারিদের বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং শুধুমাত্র দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভর না করে কাঁচা ঘাসের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে উৎপাদন খরচ কমে।

তিনি আরও বলেন, সব খামারি কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশু প্রস্তুত করেন। ফলে একই সময়ে বাজারে পশুর সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম কমে যায়। বছরে অন্যান্য উৎসব ও সময়কে কেন্দ্র করেও পশু লালন-পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোরবানির হাটে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কঠোর নজরদারি থাকবে। প্রতিটি হাটে ভেটেরিনারি টিম দায়িত্ব পালন করবে এবং অসুস্থ পশু, পেটে বাচ্চা থাকা গাভী বা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মোটাতাজা করা পশু বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

যশোরের নাভারন সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার আরিফ হোসেন বলেন, কোরবানির হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে সবাই নির্বিঘ্নে কেনাবেচা করতে পারেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন

Back to top button