সেন্টমার্টিনের দিকে আরাকান আর্মির চোখ: দখলের হুমকি, জেলেদের চাঞ্চল্যকর তথ্য

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সাথে সংঘাতের পর রাখাইনের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা দখলে নিয়েছে দেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। অঞ্চলটি দখলে নেওয়ার পর দফায় দফায় বাংলাদেশের জলসীমা থেকে জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও বন্ধ করতে পারেনি সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)। সীমান্তে নানা প্রচেষ্টার পর বিজিবির মধ্যস্থতায় অনেকে মুক্তি পেয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপ দখল করার হুমকি দিচ্ছে বলে দাবি করেছেন ফিরে আসা জেলরা। হুমকির বিষয়টিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৯ আগস্ট বিভিন্ন সময় আরাকান আর্মি কর্তৃক অপহরণের শিকার ২৪ জন জেলেকে বিজিবির মধ্যস্থতায় ফেরত আনা হয়। ফেরত আসা জেলেরা আরাকান আর্মি বাংলাদেশে প্রবেশ করে সেন্টমার্টিন দখলের হুমকির বিষয়টি সাংবাদিকদের জানায়।
যদিও আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরাকান আর্মির জিম্মিদশা থেকে ফেরত আসা শাহপরীর দ্বীপ ডাঙ্গরপাড়া এলাকার ট্রলার মালিক ও মাঝি রাশেদ জানান, গেলো বছর ১৮ ডিসেম্বর বঙ্গোপসগরে সেন্টমার্টিনের অদূরে বাংলাদেশের জলসীমার অভ্যন্তরে মাছ ধরার সময়, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর দুইটি জাহাজের মাঝখান থেকে আরাকান আর্মি অস্ত্রের মুখে ট্রলারসহ তাদের ধরে নিয়ে যায়। তাদেরকে বেআইনিভাবে আটকে রেখে আরাকান আর্মির আদালতে ৮ বছরে সাজা দেওয়া হয়। কারাগারে আরো শতাধিক বাংলাদেশী বন্দি রয়েছে।
আরাকান আর্মির বরাতে রাশেদ আরো জানায়- “তোদের সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীকে বলিস, সেন্টমার্টিন রাখাইনের অংশ, সেটি আমরা দখল করে নেবো”।
গত ৯ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে তার নৌবহরের সামনে থেকে আরাকান আর্মি একটি মাছ ধরার ট্রলারকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি নৌকাসহ ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বাংলাদেশি ২২২ জন ও রোহিঙ্গা ২১২ জন। তবে বিজিবির প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। ফেরত আনা জেলের মধ্যে বাংলাদেশি ১৫৭ জন ও রোহিঙ্গা ১৯১ জন। বর্তমানে মিয়ানমারের কারাগারে বাংলাদেশি ৬৫ জন ও রোহিঙ্গা ২১ জন বন্দী রয়েছেন।
অপরদিকে, চলতি বছর হোয়াইক্যং সীমান্তে মিয়ানমারের বিজিপি ও আরাকান আর্মির মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনান নিহত হয়। একই ঘটনায় আদিলুর রহমান নামে আরেকজন আহত হয়। এর আগে আরাকান আর্মির ছুঁড়া গুলি ও মর্টার শেল স্থানীয়দের বাড়ি-ঘরে আঘাত হানে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর আক্কাস আহমদ ‘বার্তা বাজার’কে বলেন- আরাকান আর্মি মূলত একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন। তবে তারা আগামীতে বাংলাদেশের জন্য ক্যান্সার। গোষ্ঠীটি সেন্টমার্টিন দখল করার মতো এখনো সে সক্ষমতায় পৌঁছাতে না পারলেও, তাদের হুমকিকে অবজ্ঞার চোখে দেখার সুযোগ নেই। কারণ তাদের পেছনে তৃতীয় বড় শক্তির হাত রয়েছে। তারা আরাকান আর্মিকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবেশ ঘোলাটে করে এই অঞ্চলে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তাই সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূ-জলসীমানায় অনুপ্রবেশ করে আরাকান আর্মির সকল তৎপরতা রাষ্ট্র কঠোরভাবে দমন করতে না পারলে খেসারত দিতে হবে।







