বিশ্ব সংবাদ

গাজার দুর্ভিক্ষ: এক বছর পরও কেন থামছে না মৃত্যু ও অনাহার?

গত বছরের ২২ আগস্ট জাতিসংঘ-সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে গাজা গভর্নরেট, যার মধ্যে গাজা সিটিও রয়েছে, সেখানে দুর্ভিক্ষের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। সংস্থাটির মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২৫ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়েই সেখানে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন ৫ লাখের বেশি মানুষ অনাহার, চরম দারিদ্র্য ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে ছিলেন।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও পরিস্থিতিটিকে ‘গাজার দুর্ভিক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন

তিনি বলেন, এই দুর্ভিক্ষ ঠেকানো সম্ভব ছিল। গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা এবং ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের চালানো যুদ্ধ এর জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ফ্লেচারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ এবং কিছু ইসরাইলি নেতা প্রকাশ্যেই এটিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছিলেন।

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির পর মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ কিছুটা বাড়লে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিরও উন্নতি হতে শুরু করে। তবে তার আগে প্রায় দুই মাস ধরে ভয়াবহ পরিস্থিতি চলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপুষ্টিতে শত শত ফিলিস্তিনি মারা যান, যাদের মধ্যে অন্তত ১৩০ জন শিশু ছিল।

২২ আগস্ট হঠাৎ দুর্ভিক্ষ তৈরি হয়নি

গাজায় দুর্ভিক্ষ ২২ আগস্ট হঠাৎ করে শুরু হয়নি। আইপিসির আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই ছিল কয়েক মাস ধরে চলা সতর্কবার্তার পরিণতি। এর আগেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছিল, গাজার খাদ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।

ইসরাইল গাজায় মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর কাজ ক্রমেই কঠিন করে তুলেছিল। এমনকি ত্রাণকর্মীরাও হামলার শিকার হন। ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল ইসরাইলি হামলায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাতজন কর্মী নিহত হন।

দুর্ভিক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার আগেই জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বহু প্রতিষ্ঠান গাজায় দ্রুত, নিরাপদ ও বাধাহীন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিল।

২০২৫ সালের মে মাসেই আইপিসি সতর্ক করেছিল, মানবিক সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারায় গাজায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।

পরবর্তী পরিস্থিতিই দেখিয়ে দেয়, খাদ্য সরবরাহে প্রবেশাধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর মানবিক ও বাণিজ্যিক খাদ্য সরবরাহ বাড়লে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়। ডিসেম্বরের মধ্যে আইপিসি জানায়, দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি আর বিরাজ করছে না। তবে তখনও ১ লাখের বেশি মানুষ ভয়াবহ মাত্রার খাদ্যসংকটে ছিলেন এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি ছিল সংকটপূর্ণ।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার বাড়লে যদি দুর্ভিক্ষ কমে যায়, তাহলে সেটি তৈরি হতে দেওয়া হয়েছিল কেন?

আবারও কি একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?

এখন গাজায় যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তা একই ধরনের প্রাণঘাতী কৌশলের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন।

২০২৫ সালে ইসরাইলি নীতির মধ্যে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আলোচিত হচ্ছিল। খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধও এমন একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছিল। যার ফলে গাজায় জীবনযাপন অসহনীয় করে তোলা এবং মানুষকে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ ওঠে।

কিন্তু গাজা থেকে ব্যাপকসংখ্যক ফিলিস্তিনি চলে না যাওয়ায় একই ধরনের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণের কৌশল এখন ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে আলোচনার সময় খাদ্য ও মানবিক সহায়তা আটকে রাখা চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ প্রকাশ্যেই অবরোধকে হামাসের বিরুদ্ধে ‘চাপ তৈরির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

বর্তমানে আলোচনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে যেসব পদক্ষেপ এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে।

এ অবস্থায় খাদ্য ও মানবিক সহায়তাকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করা হলে গত বছরের দুর্ভিক্ষ থেকে বিশ্ব আদৌ কী শিখেছে—সেই প্রশ্ন আবারও সামনে আসে।

বিশ্ব কি সত্যিই শিক্ষা নিয়েছে?

গাজার দুর্ভিক্ষ থেকে বিশ্ব কিছু শিক্ষা নিয়েছে—এ কথা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু শিক্ষা নেওয়া এবং সেই শিক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়।

দুর্ভিক্ষ ঘোষণার আগে কয়েক মাস ধরে সতর্কবার্তা ছিল। পরিস্থিতির উন্নতিও ঘটেছিল তখনই, যখন দুর্ভিক্ষ তৈরির অন্যতম কারণ—মানবিক সহায়তা প্রবেশের সীমাবদ্ধতা—কিছুটা কমানো হয়েছিল।

কিন্তু গাজার খাদ্যব্যবস্থা এখনো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কৃষি উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। জনগণের বড় অংশ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খাদ্যের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তার প্রবেশাধিকার এখনো এমন রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, যার নিয়ন্ত্রণ ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে নেই।

এখানেই গাজার দুর্ভিক্ষ থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ শিক্ষা পাওয়া যায়। বিশ্ব হয়তো দুর্ভিক্ষ কীভাবে পরিমাপ করতে হয়, তা আগের চেয়ে ভালোভাবে শিখেছে; কিন্তু কীভাবে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করতে হয়, তা এখনো যথেষ্টভাবে শিখতে পারেনি।

যদি গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা চলার সময় আবারও খাদ্য ও মানবিক সহায়তা আটকে রেখে চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রশ্নটি শুধু গত বছরের দুর্ভিক্ষ থেকে বিশ্ব শিক্ষা নিয়েছে কি না—সেটি থাকবে না।

প্রশ্ন হবে, বিশ্ব যে শিক্ষা ইতিমধ্যে পেয়েছে, সেটি বাস্তবে প্রয়োগ করার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা তার আছে কি না।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন

Back to top button