ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সৌরভী খানম দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় ডেপুটেশনে থাকায় বিদ্যালয়টির নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক সংকটের মধ্যেও ওই শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে পাঠদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার গুলশান সিটি করপোরেশন এলাকার কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তিতে থাকা অবস্থায় গত ২৭ জুলাই সৌরভী খানম তার মূল কর্মস্থল নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো ধরনের যোগদানপত্র ছাড়াই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। পরে একই দিন বিকেলে বিদ্যালয়ে গিয়ে ওই স্বাক্ষর ফ্লুইড দিয়ে মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
যোগদানের পর থেকেই বদলি ও ডেপুটেশন
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সৌরভী খানম ২০২০ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর উপজেলার হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪ বছর ১১ মাস ১২ দিন দায়িত্ব পালন করেন। পরে অনলাইন বদলি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২৫ সালে একই উপজেলার নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন। গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি সেখানে যোগদান করেন।
তবে বদলির প্রায় সাত মাসের মধ্যেই তিনি ঢাকার গুলশান সিটি করপোরেশন এলাকার কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য সংযুক্তিতে যান। সেখানে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের পর চলতি বছরের ২৫ মার্চ পুনরায় অধিদপ্তর থেকে সংযুক্তির আদেশ করান বলে জানা গেছে।
এদিকে নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। একই বিদ্যালয়ের আরেকজন সহকারী শিক্ষক মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ফলে সৌরভী খানমের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের।
মূল স্কুলে হাজিরা, পরে স্বাক্ষর মুছে ফেলার অভিযোগ
ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে গত ২৭ জুলাইয়ের ঘটনায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন সৌরভী খানম নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো যোগদানপত্র না দিয়েই হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর করেন। পরে বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় করা নিজের স্বাক্ষর ফ্লুইড দিয়ে মুছে দেন।
ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—সংযুক্তিতে থাকা একজন শিক্ষক কীভাবে মূল কর্মস্থলে গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করলেন এবং পরবর্তীতে তা মুছে ফেললেন। একই সঙ্গে এক শিক্ষক একই দিনে দুই প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি দেখিয়েছেন কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা।
‘এটা মারাত্মক অন্যায়’
বিজয়নগর উপজেলা শিক্ষা অফিসার স্বর্ণজিৎ দেব বলেন, “একজন সহকারী শিক্ষক সংযুক্তিতে থাকার পর মূল স্কুলে যোগদান না করে হঠাৎ এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়া এবং পরে সেটি মুছে ফেলা মারাত্মক অন্যায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
গুলশান কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মুঠোফোনে বলেন, সৌরভী খানম তার প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে কর্মরত। তিনি ২৬ ও ২৭ জুলাই দুই দিন ছুটিতে ছিলেন। তবে কেন তিনি ওই সময় মূল বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর করেছেন, তা তিনি সঠিকভাবে বলতে পারেননি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
গুলশান থানা শিক্ষা অফিসার মাহরুক জাবীন বলেন, “একজন শিক্ষক সংযুক্তি বিদ্যালয়ে থাকার পর মূল বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা অন্যায়। একজন শিক্ষক একই দিনে কীভাবে দুই প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি দেন, সেটাও বুঝতে পারছি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে খোঁজখবর নেব।”
নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু হানিফ বলেন, “সৌরভী খানম আগেও এক বছর ঢাকার গুলশানের একটি বিদ্যালয়ে সংযুক্তিতে ছিলেন। তিনি আবারও এক বছরের জন্য সংযুক্তির আদেশ করেছেন বলে জেনেছি।”
সংযুক্তির নীতিমালা কী বলছে?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংযুক্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পাঠদান বিঘ্নিত হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একই উপজেলার অভ্যন্তরে সংযুক্তির আদেশ দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য সংযুক্তির আদেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
নীতিমালায় আরও উল্লেখ রয়েছে, নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সংযুক্তির আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এবং একই শিক্ষককে একাধিকবার সংযুক্তি দেওয়া যাবে না।
এই নীতিমালার আলোকে সৌরভী খানমকে পুনরায় সংযুক্তির আদেশ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তার মূল কর্মস্থলে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় অবস্থানের কারণে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এক মাসেও ব্যবস্থা নেই
ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সৌরভী খানমের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকটি ঢাকায় দায়িত্ব পালন করায় নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। নিয়মিত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে।
স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
