
মনছুর আলম মুন্না
যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ ও ভ্রমণ বাতিলের প্রভাবে পর্যটন ব্যবসা স্থবির হোটেল-মোটেলের অধিকাংশ কক্ষ ফাঁকা, বুকিং নেমেছে খবরের কাগশতাংশের নিচে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের দৈনিক আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার ছিল প্রায় পর্যটকশূন্য। ভোট উপলক্ষে মানুষ নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করায় এবং যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় পর্যটন খাতে বড় ধস নেমেছে। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত ১৫ দিনেই শতকোটি টাকার লোকসান হয়েছে। নির্বাচনি প্রভাব কাটতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
গত বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি দূরপাল্লার যান চলাচল। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় পর্যটক না আসায় কিছুটা হতাশ সৈকতপাড়ের ব্যবসায়ীরা। তবে নতুন সরকার গঠনের পর পর্যটক সমাগম বাড়বে-এমন আশায় বুক বেঁধেছেন তারা। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটের দিনসহ আগে-পরে যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে নির্বাচন কমিশন। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত আটো, ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ফলে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস উদযাপনে পর্যটকের দেখা মেলেনি কক্সবাজারে। এ সময়ের মধ্যে বহু পর্যটক আগের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেন।
পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, শহরের অধিকাংশ হোটেলে কক্ষ বুকিং নেমে এসেছে ১০ শতাংশের নিচে। কোথাও কোথাও তারকা হোটেলে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রুম বুকিং থাকলেও সাধারণ হোটেলগুলোতে বুকিং নেই বললেই চলে। এতে হোটেল খাতের পাশাপাশি খাবারের দোকান, বিনোদন কেন্দ্র এবং ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরাও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কক্সবাজার হোটেল- গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে অনেকে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। হোটেল খাতের কর্মীরাও ছুটিতে গেছেন। পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় পর্যটকদের ঘোরাফিরা সীমিত হয়েছে। এ কারণে হোটেল-মোটেল জোন ও সমুদ্রসৈকত ফাঁকা রয়েছে। অন্যান্য ছুটির দিনের তুলনায় এবার পর্যটন খাতে শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
ট্যুরিস্ট ক্লাব ও ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, নির্বাচনি পরিস্থিতির কারণে হোটেল-মোটেলে বুকিং কমেছে। তারকা হোটেলে ১০-১৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং রয়েছে, যার বেশির ভাগ বিদেশি নাগরিক। দেশীয় পর্যটক তেমন নেই বললেই চলে। মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচনি আবহে পর্যটন জোনে নীরবতা নেমে এসেছে।
গত শুক্রবার এবং শনিবার দুপুরে সৈকতের ব্যস্ততম সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে হাতে গোনা কয়েকজন পর্যটক দেখা যায়। ভ্রাম্যমাণ ঝালমুড়ি, পান-সিগারেট ও আচার বিক্রেতারা ক্রেতার আশায় বসে ছিলেন। পর্যটক কমে যাওয়ায় তাদের দৈনিক আয় ব্যাপকভাবে কমেছে। তবে গতকাল শনিবার কিছুটা লোক সংক্ষ দেখা যায়, সেটিও আশানরূপ নয়।
ঝালমুড়ি বিক্রেতা আল আমিন বলেন, ‘পর্যটক না থাকায় বেচাকেনা নেই বললেই চলে। অন্য সময় ছুটির দিনে প্রতিটি পয়েন্ট পর্যটকে ভরপুর থাকে। এবার নির্বাচনকে ঘিরে সৈকত ফাঁকা, আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’ লাবণী পয়েন্টের আচার বিক্রেতা রাজিব দাস বলেন, ‘আগে দিনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হতো। এখন ৪০০ টাকাও হচ্ছে না।’
শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিন বলেন, ‘ভালোবাসা দিবসে একটু হলেও হতাশ। কারণ নির্বাচনের সময়টাতে পর্যটকের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা কমে গেছে। বেশির ভাগ মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন, ফলে পর্যটন খাতে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তবে এখন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, নতুন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে-এই আশাই করছি।’
চটপটি বিক্রেতা রাসেল বলেন, ‘পর্যটক থাকলে দিনে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা আয় হতো। এখন নিজের খরচই তুলতে পারছি না। কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
ঝিনুক ব্যবসায়ী রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক না থাকলে দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যেতে হয়। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে থেকেই দোকান বন্ধ রেখে, ঘরে অলস সময় পার করছি।
জুনায়েদ নামের এক পর্যটক জানান, নির্বাচনের কারণে স্বাভাবিক ভিড় নেই। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব পড়েছে। রাজশাহী থেকে আসা হাসান তৌফিক বলেন, ‘নির্বাচনের কারণে অনেকে ভ্রমণ বাতিল করেছেন। আমরা আগেই পরিকল্পনা করেছিলাম, তাই চলে এসেছি। তবে সৈকত এত ফাঁকা আগে কখনও দেখিনি।’ সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে আসা রুকাইয়া সুলতানা বলেন, ‘ভিড় না থাকায় ঘোরাঘুরি করে অনেক আরামদায়ক অভিজ্ঞতা ঠিকই। কিন্তু দোকানপাট ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো ফাঁকা। আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই।’ ঢাকার বনশ্রী থেকে আসা চাকরিজীবী রাফি করিম বলেন, ‘পরিবহন সীমিত থাকায় অনেকেই আসতে পারেননি। আমাদেরও বাস, ট্রেনের টিকিটই পাচ্ছিলাম না পরে, আমরা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে এসেছি। হোটেলে রুম পাওয়া সহজ হয়েছে, তবে পর্যটক কম থাকায় পুরো শহরটা কেমন নিরব মনে হচ্ছে।’ খুলনা থেকে আসা রিদুয়ান-সাইরিন দম্পতি জানান, তারা মূলত ছুটির সুযোগে এসেছেন। কিন্তু নির্বাচনি পরিবেশের কারণে অনেক বন্ধু-পরিচিত তাদের ভ্রমণ স্থগিত করেছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, ‘ভোটের সময় মানুষ নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করায় তুলনামূলকভাবে পর্যটক কম ছিল। তবে দু-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবারও পর্যটকরা কক্সবাজারে ভিড় করবেন।





