ধর্ম ও জীবন

বাল্যবিবাহমুক্ত উখিয়া গড়তে একাট্টা সবাই: শাহজাহান চৌধুরী

উখিয়ার কোনো গ্রামে বাল্যবিবাহের খবর পেলেই স্থানীয় তরুণ, শিশু ফোরাম, গ্রাম উন্নয়ন সোসাইটি ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা সক্রিয় হন। বয়স যাচাইয়ে জন্মনিবন্ধন দেখা, সম্ভাব্য বাল্যবিবাহের খবর প্রশাসনকে জানানো এবং স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের বিয়ের চাপ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করা হচ্ছে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবারকে অর্থনৈতিক সহায়তা, প্রশাসনিক নজরদারি, আইন প্রয়োগ ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে উখিয়ায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উখিয়ার পাঁচ ইউনিয়নে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, অভিভাবক, শিশু-কিশোর, যুব, গণমাধ্যমকর্মী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোও এতে যুক্ত হয়েছে।

রোববার সকালে উপজেলা প্রশাসন ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বাল্যবিবাহ প্রতিরোধবিষয়ক সুধী সমাবেশে উখিয়াকে শতভাগ বাল্যবিবাহমুক্ত উপজেলা করার ঘোষণা দেন কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার।

শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “উখিয়াকে শতভাগ বাল্যবিবাহমুক্ত করতে হবে। নারীদের সুরক্ষা ও নিরাপদে স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি ইমামদের জুমার খুতবায় বাল্যবিবাহবিরোধী বক্তব্য দেওয়া এবং সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, “বাল্যবিবাহকে না বলুন; কন্যাশিশুকে সম্পদে পরিণত করুন।” তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কমিটি ও অংশীজনদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

তবে উখিয়ায় বাল্যবিবাহের বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি বদলায়নি। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, উপজেলায় ১৮ বছরের আগে মেয়েশিশুদের বিয়ের হার ছিল ৬০ দশমিক ১ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে এ হার ৫২ দশমিক ২ শতাংশ। কোভিড-১৯ সময়ে কোস্ট ফাউন্ডেশনের এক জরিপে উখিয়ায় এ হার ৭৫ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল।

ওয়ার্ল্ড ভিশনের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়ায় ৯ হাজার ৬৪৯ জন মেয়েশিশু ও ১০ হাজার ২১১ জন ছেলেশিশুসহ মোট ১৯ হাজার ৮৬০ জন শিশু বিভিন্নভাবে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে।

জরিপে বাল্যবিবাহের পেছনে অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষার অভাব, কন্যাশিশুদের চলাফেরায় নিরাপত্তাহীনতা, উত্যক্ত ও হয়রানির আশঙ্কা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি সম্পর্ক, সামাজিক সম্মানহানির ভয়, ঋতুমতী হওয়ার পর বিয়ে দেওয়ার মানসিকতা, যৌতুক এবং ভালো পাত্রের প্রস্তাব হাতছাড়া না করার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। আইন থাকার পরও স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োগের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনি নিবন্ধন এড়াতে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে গোপন ও বেআইনি চুক্তিপত্র, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে এবং বয়স জালিয়াতি করে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরির বিষয়ও উঠে এসেছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে হোস্ট কমিউনিটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় তৈরি অস্থিতিশীলতা পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলেও তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমার চিত্রও রয়েছে। গবেষণা সংস্থার মূল্যায়ন জরিপ অনুযায়ী, গত এক বছরে কিশোরীদের মধ্যে উখিয়ায় বাল্যবিবাহের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। জরিপ, অংশীজনদের সাক্ষাৎকার, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দলীয় আলোচনা ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে বিগত দুই বছরের তুলনায় প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে ওয়ার্ল্ড ভিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতে, জনসচেতনতা, প্রশাসনের নজরদারি, আইন প্রয়োগ, ইউনিয়ন পরিষদ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রম এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

পাঁচ ইউনিয়নে উঠান বৈঠক, সচেতনতামূলক সভা, লিফলেট বিতরণ ও পথনাটকের মাধ্যমে ১ লাখ ২৫ হাজার ২০৮ জনকে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে। মোবাইল ফোনে ১০ হাজার বাল্যবিবাহ নিরোধবিষয়ক ভয়েস মেসেজ প্রচার করা হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা ৪৮২ জন মেয়েশিশুকে মাসিক উপবৃত্তি, ২ হাজার ৮০০ জনকে জীবনদক্ষতা, অধিকার ও বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং ৪০ জনকে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১ হাজার ২০০ কিশোর-কিশোরীকে ইম্প্যাক্ট প্লাস দলে সংগঠিত করে নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাস তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

পরিবারের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতি দরিদ্র ৪ হাজার ২০৯টি পরিবারকে উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা কন্যাশিশুদের দরিদ্র পরিবারে সুদমুক্ত ঋণ, আয়বর্ধকমূলক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া ঠেকাতে মেয়েশিশুদের মাসিক বৃত্তি ও জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাল্যবিবাহবিরোধী ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়েছে।

সামাজিক নজরদারির অংশ হিসেবে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহায়তায় পাঁচটি চ্যাট (CHAT) কমিটি, ১১টি চাইল্ড অ্যান্ড ইয়ুথ ফোরাম এবং ৩৫টি ভিডিএস মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। সম্ভাব্য বাল্যবিবাহের খবর পেলে তারা প্রশাসনকে জানাচ্ছে। পাঁচ ইউনিয়নের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিও সক্রিয় রয়েছে।

বিয়ের বয়স যাচাইয়ে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৬২টি গ্রামকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমেও ইউনিয়নগুলোকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কাজী ও বিবাহ নিবন্ধকদের সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। মসজিদের ইমাম, কাজী ও শিক্ষকেরা জুমার খুতবা ও স্কুল সমাবেশে বাল্যবিবাহের কুফল তুলে ধরছেন।

এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক করা হয়েছে। ২০টি এনজিওর সমন্বয়ে অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন গঠন করা হয়েছে। গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশু ও ইয়ুথ ফোরাম, চ্যাট কমিটি এবং গ্রাম উন্নয়ন সোসাইটিগুলো সক্রিয় করা হয়েছে। ৯৯৯, ১০৯৮ ও ১০৯ হটলাইন ও টোল-ফ্রি নম্বরও প্রচার করা হয়েছে।

উখিয়ায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ওই বছর থেকে রাজাপালং, জালিয়াপালং, রত্নাপালং, হলদিয়াপালং ও পালংখালী ইউনিয়নে শিশু সুরক্ষায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে ওয়ার্ল্ড ভিশন। স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে ২০২৪ সাল থেকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ওই বছরের জানুয়ারিতে জালিয়াপালং ইউনিয়নের পাটোয়ারটেক ও মনখালী এবং রাজাপালং ইউনিয়নের খয়রাতি পাড়া ও গুচ্ছ গ্রামকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়।

এখন উখিয়াকে পুরোপুরি বাল্যবিবাহমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। সব ইউনিয়ন পরিষদের মতামত ও সম্মতি নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা, আইনি মতামত ও নির্দেশনা গ্রহণ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের সম্মতি নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, কমিউনিটিভিত্তিক কমিটি, ধর্মীয় নেতা, কাজী ও বিবাহ নিবন্ধকদের সঙ্গে প্রস্তুতি সভা হয়েছে।

গ্রাম উন্নয়ন সোসাইটি, শিশু ফোরাম ও যুবদের নিয়ে গঠিত ইয়ুথ ভিজিল্যান্স টিম সম্ভাব্য বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ করছে। গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরী ও অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে।

স্বাগত বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কক্সবাজার এরিয়া কো-অর্ডিনেশন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার রোনাল্ড প্রবীর চিসিক বলেন, “২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ করছে ওয়ার্ল্ড ভিশন।”

উখিয়ায় বাল্যবিবাহের হার কমলেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা গোপনে বা অন্য এলাকায় গিয়ে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এখনো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও এ প্রবণতার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই প্রশাসনের নজরদারি, সামাজিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা এবং পরিবার ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সুধী সমাবেশে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেইফটি নেট প্রজেক্টের ম্যানেজার সাগর ডি কস্তা। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী এবং কক্সবাজার জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক সরওয়ার আকবর। সার্বিক সমন্বয় করেন ওয়ার্ল্ড ভিশনের উপজেলা কো-অর্ডিনেটর ছোটন বড়ুয়া ও প্রোগ্রাম অফিসার খ্রীষ্টপার কুঁইয়া। সুধী সমাবেশে জনপ্রতিনিধি, সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী, বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা, শিশু, যুব, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণ উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন

Back to top button