মহাকাশের শূন্যস্থান কি সত্যিই শূন্য? কোয়ান্টাম প্রভাবের নতুন প্রমাণ।

গবেষকদের মতে, চরম শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র শূন্যস্থানের বৈশিষ্ট্য বদলে দিতে পারে। তখন আপাত ফাঁকা মহাকাশ অনেকটা প্রিজমের মতো আচরণ করে এবং এর মধ্য দিয়ে চলার সময় আলোর বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটে
মহাকাশের আপাত শূন্যস্থান বাস্তবে পুরোপুরি শূন্য নয়। সেখানে অতি অল্প সময়ের জন্য প্রতিনিয়ত সৃষ্টি ও বিলীন হচ্ছে অদৃশ্য কণা। শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে এসব কণা আলোর চলার পথও বদলে দিতে পারে। প্রায় ৯০ বছর আগে করা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এমনই একটি পূর্বাভাসের পক্ষে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকীয় মৃত তারা বা ম্যাগনেটার পর্যবেক্ষণ করে এ প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী র্যাচেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, চরম শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র শূন্যস্থানের বৈশিষ্ট্য বদলে দিতে পারে। তখন আপাত ফাঁকা মহাকাশ অনেকটা প্রিজমের মতো আচরণ করে এবং এর মধ্য দিয়ে চলার সময় আলোর বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটে।
গবেষকরা ১ই ১৫৪৭-৫৪০৮ নামের একটি অত্যন্ত চৌম্বকীয় মৃত তারা বা ম্যাগনেটার পর্যবেক্ষণ করেন। ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিলে নাসার ইমেজিং এক্স-রে পোলারিমেট্রি এক্সপ্লোরার বা আইএক্সপিই ব্যবহার করে তারাটি থেকে আসা এক্স-রের পোলারাইজেশন পরিমাপ করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা একটি এক্স-রে টেলিস্কোপ, অস্ট্রেলিয়ার মুরিয়াং রেডিও টেলিস্কোপ এবং সাউথ আফ্রিকান রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি অবজারভেটরির তথ্যও বিশ্লেষণ করেন তারা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ম্যাগনেটারটি থেকে আসা এক্স-রে একই ধরনের অন্য উৎসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি পোলারাইজড। শুধু নিউট্রন তারার পৃষ্ঠ থেকে বিকিরণ নির্গমনের প্রচলিত মডেল দিয়ে এত উচ্চমাত্রার পোলারাইজেশন ব্যাখ্যা করা যায় না। একই সঙ্গে এক্স-রের পোলারাইজেশন নক্ষত্রটির চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকে বিন্যস্ত ছিল, যা এর রেডিও তরঙ্গেও দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, ‘ভ্যাকুয়াম বাইরেফ্রিনজেন্স’ নামের কোয়ান্টাম প্রভাব ছাড়া এ দুটি ফল একসঙ্গে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর অর্থ, প্রবল চৌম্বক ক্ষেত্র ম্যাগনেটারটির চারপাশের শূন্যস্থানের বৈশিষ্ট্য বদলে দিয়ে আলোর চলাচলে প্রভাব ফেলছে।
র্যাচেল স্টুয়ার্ট বলেন, ‘দূরের একটি মৃত নক্ষত্রের কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া তথ্য আমাদের বাস্তবতার মৌলিক কাঠামো সম্পর্কেও ধারণা দিচ্ছে। বিষয়টি আমার কাছে অবিশ্বাস্য।’
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ফল হিসেবে বিবেচিত এ অদৃশ্য কণাপ্রবাহ সাধারণ পরিস্থিতিতে শনাক্ত করা যায় না। তবে তত্ত্ব অনুসারে, অত্যন্ত শক্তিশালী কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র আলোর চলাচল বদলে দিতে পারে। এতে আলোকতরঙ্গ একটি নির্দিষ্ট দিকে অধিক মাত্রায় বিন্যস্ত বা পোলারাইজড হয়। এ ঘটনাকে বলা হয় ‘ভ্যাকুয়াম বাইরেফ্রিনজেন্স’।
ম্যাগনেটার হলো বিশাল কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরিত হওয়ার পর অবশিষ্ট ঘন ও শহর আকৃতির ক্ষুদ্র মৃত কেন্দ্র। মহাবিশ্বে এখন পর্যন্ত শনাক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে এসব নক্ষত্রে। পৃথিবীতে তৈরি করা অসম্ভব এমন পরিবেশে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র পরীক্ষা করার সুযোগ দেয় এগুলো।
এবার গবেষকরা নাসার ইমেজিং এক্স-রে পোলারিমেট্রি এক্সপ্লোরার বা আইএক্সপিই ব্যবহার করেছেন। উচ্চশক্তির এক্স-রের পোলারাইজেশন পরিমাপের জন্য তিনটি অভিন্ন টেলিস্কোপ নিয়ে ২০২১ সালে মহাকাশে যাত্রা করে আইএক্সপিই। ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিলে এর মাধ্যমে ১ই ১৫৪৭-৫৪০৮ নামের একটি ম্যাগনেটার পর্যবেক্ষণ করা হয়। নক্ষত্রটি প্রতি দুই সেকেন্ডে একবার নিজের অক্ষে ঘোরে। নিয়মিত রেডিও তরঙ্গ নিঃসরণ করায় এটি অন্য ম্যাগনেটারের তুলনায় ব্যতিক্রমী।
গবেষণায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা একটি এক্স-রে টেলিস্কোপ, অস্ট্রেলিয়ার মুরিয়াং রেডিও টেলিস্কোপ এবং সাউথ আফ্রিকান রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি অবজারভেটরির তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পান বিজ্ঞানীরা। প্রথমত, আইএক্সপিইর শনাক্ত করা এক্স-রে একই ধরনের অন্য উৎসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি পোলারাইজড ছিল। নিউট্রন তারার পৃষ্ঠ থেকে নির্গত বিকিরণের প্রচলিত মডেল দিয়ে এত উচ্চমাত্রার পোলারাইজেশন ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, পোলারাইজেশনের দিক নক্ষত্রটির চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এর রেডিও তরঙ্গেও একই বিন্যাস দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, তথ্য দুটির সমন্বিত ব্যাখ্যায় ভ্যাকুয়াম বাইরেফ্রিনজেন্স ছাড়া আর কোনো কার্যকর কারণ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভবিষ্যৎ মহাকাশ মিশনের তথ্য ও উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে ফলটি আরো নিশ্চিত করতে চান তারা। গবেষণাটি ৫ আগস্ট নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।





