বিভাগ

বালুমহালের দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত হরিরামপুর, একসময়ের শান্তির জনপদে এখন সংঘাত

সাইফুল ইসলাম : পদ্মা নদীবেষ্টিত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর একসময় শান্তির জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, পদ্মা নদীর বালুমহাল ও নৌ চ্যানেলের চার্জ আদায়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ, হামলা-পাল্টা হামলা ও মামলার ঘটনায় সেই চিত্র বদলে গেছে। সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও মুখোমুখি অবস্থানকে কেন্দ্র করে থানার সামনে বিস্ফোরণের শব্দ এবং পেট্রোলবোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—শান্তির জনপদ হরিরামপুরকে অশান্ত করে তুলছে কারা?

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হরিরামপুরের পদ্মা নদীতে বালুমহালের ইজারা নিয়ে বালু উত্তোলন করছেন ধুলশুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি বিল্লাল খান। অন্যদিকে পদ্মা নদীর নৌ চ্যানেলের চার্জ আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছেন উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মোল্লা শাহীন। বালুমহাল ও চ্যানেল চার্জ আদায়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছে।

মোল্লা শাহীন ও তার অনুসারীদের অভিযোগ, বালুমহালের ইজারাদাররা নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। তাদের দাবি, এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাদের ওপর হামলা ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। অপরদিকে বিল্লাল খানের পক্ষের অভিযোগ, নৌ চ্যানেলের নামে বাল্কহেড থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে তারা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন এবং মামলাও করেছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার দুপুরে পদ্মা নদীতে চলাচলকারী বাল্কহেড থেকে চ্যানেল চার্জ আদায়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। পরে দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে থানায় পৃথক অভিযোগ দেয়। পুলিশ জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি মামলাই রুজু করা হয়েছে।

মামলা দায়েরের পর সোমবার দুপুরে মোল্লা শাহীনসহ তার অনুসারীরা থানা ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দেন। একই সময়ে বিল্লাল খানের পক্ষ থেকে কথিত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের প্রতিবাদে ঝাড়ু-জুতা মিছিল ও মানববন্ধনের কর্মসূচি পালন করা হয়।

মিরাজ হোসেন মেম্বারের সঞ্চালনায় এবং বাদল শিকদারের সভাপতিত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা অংশ নেন। তাদের অভিযোগ, যুবদল নেতা মোল্লা শাহীন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চাঁদাবাজি, জমি দখল, লুটপাট ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন মোল্লা শাহীনপন্থীরা।

অন্যদিকে, বিল্লাল খানসহ তার পক্ষের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে মামলা প্রত্যাহার ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে থানা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন মোল্লা শাহীনপন্থীরা। কর্মসূচিতে গালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শফিক বিশ্বাসও উপস্থিত ছিলেন।

শফিক বিশ্বাস বলেন, প্রশাসনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের দোসরদের প্রতিহত করতেই এ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। তবে কারা আওয়ামী লীগের দোসর—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। প্রশাসনের ইন্ধনেই দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

একপর্যায়ে দুই পক্ষ হরিরামপুর থানার সামনে মুখোমুখি অবস্থান নিলে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে থানার সামনে থেকে চারটি পেট্রোলবোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এসব সরঞ্জাম সেখানে কারা রেখেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দুই পক্ষের কর্মসূচির ধরনেও দেখা গেছে ভিন্নতা। এক পক্ষ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করলেও অপর পক্ষ থানা ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেয় এবং প্রশাসনকে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়। এতে দ্বিতীয় পক্ষের কর্মসূচি তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

হরিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফজাল হোসাইন বলেন, নদীতে সংঘর্ষের ঘটনায় এক পক্ষের দাবি, তাদের ড্রেজারে চাঁদা দাবি করতে গেলে তারা তা প্রতিহত করেছে। অপর পক্ষের দাবি, তারা চ্যানেল চার্জ আদায় করতে গেলে তাদের মারধর করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুই পক্ষ পৃথক এজাহার দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দুটি মামলাই রুজু করা হয়েছে।

ওসি বলেন, মামলা রুজুর প্রতিবাদে মোল্লা শাহীনপন্থীরা থানা ঘেরাও কর্মসূচি দেয়। পুলিশ থানার গেটে অবস্থান নেওয়ায় তারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে কর্মসূচি শেষ করে। অপর পক্ষও সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ঝাড়ু-জুতা মিছিল করেছে। তারাও থানা গেট থেকে ফিরে যায়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে এলাকায় যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, বালুমহাল, নৌ চ্যানেলের চার্জ, রাজনৈতিক আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরোধ ক্রমেই প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। একের পর এক পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, হামলা, মামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে। ফলে একসময়কার শান্তির জনপদ হরিরামপুরের অশান্তির পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন

Back to top button