বিভাগ

বরিশালে হাঁস-মুরগির দোকানে ম্যারেজ মিডিয়া: ঘটক স্বপনের ব্যতিক্রমী গল্প

সন্ধ্যা নামতেই জমে ওঠে বরিশাল নগরীর চৌমাথা বাজার। কোথাও মাছের হাঁকডাক, কোথাও হাঁস-মুরগি কেনাবেচার ব্যস্ততা। সেই ভিড়ের মধ্যেই একটি দোকানের নাম দেখে থমকে দাঁড়িয়ে যায় অনেকে। দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ‘বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া’। দোকানের সামনে গেলে দেখা যাবে, বিয়ের কার্ড কিংবা পাত্র-পাত্রীর ছবি নয়, সাজানো আছে মুরগি, রাজহাঁস ও চিনা হাঁস। এক পাশে কবুতরের বাচ্চা, অন্য পাশে খাসি-ছাগল-গরুর মাংস।

অথচ এই দোকানেই বসে প্রতিদিন কেউ খোঁজেন পাত্র, কেউ পাত্রী। তাহলে কি হাঁস-মুরগির সঙ্গে বিয়েরও কোনো যোগসূত্র আছে? সেই গল্পটা হাঁস-মুরগির নয়, এক ঘটকের দুই দশকের জীবনের গল্প।

দোকানের মালিক শহিদুল ইসলাম স্বপন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি ঘটকালির সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় তিনি ২৫০টির বেশি বিয়ে দিয়েছেন। পাত্র-পাত্রীর খোঁজ দিতে গিয়ে পরিচিতি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে। সেই পরিচিতি ও অভিজ্ঞতাকেই তিনি কাজে লাগাচ্ছেন এখনও।

শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি ঘটক হিসেবে কাজ করি, আবার দেশি মুরগিও বিক্রি করি। দেশি মুরগি, রাজহাঁস, চিনা হাঁস, কবুতরের বাচ্চা থেকে শুরু করে লাইভ ওয়েটে খাসি, ছাগল ও গরুর মাংস বিক্রি করি। আর পাশাপাশি চলে ঘটকালি।

কেন এমন নাম রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক ক্রেতা হাঁস-মুরগি কিংবা খাসি কিনতে গিয়ে আমার কাছে ভালো পাত্র বা পাত্রী খোঁজেন। তাদের অনেকের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমি নিজে থেকে বেচাকেনার সময় কাউকে বিয়ের কথা বলি না। তবে ফেসবুকে আমার কার্যক্রম দেখে অনেকেই ফোন করেন।

বরিশাল সদর উপজেলার জাগুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম স্বপন স্থানীয় বারেক চাপরাশির ছেলে। তার বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া নামের ফেসবুক ও ইউটিউব কার্যক্রমও রয়েছে। সেখানে বিয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন তিনি।

একপর্যায়ে তার কাছে এক হাজারের বেশি পাত্র-পাত্রীর জীবনবৃত্তান্ত জমা হয়। তখন ডিশের লাইনের স্থানীয় টিভি চ্যানেল এবং স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেন। এতে বরিশালজুড়ে সাড়া পান। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক জনপ্রিয় হলে সেখানেও বিয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করেন।

স্বপন বলেন, একসময় চৌমাথা সোনালী ব্যাংকের সামনে আমার অফিস ছিল। পরে বাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অফিস ছেড়ে দিই। আর ম্যারেজ মিডিয়ার ব্যবসায় বিয়ে ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো আয় ছিল না। তাই প্রায় পাঁচ বছর আগে বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া নামেই চৌমাথা বাজারে হাঁস-মুরগি ও খাসি বিক্রির দোকান দিই।

তিনি বলেন, আমি সেসব পারি না। পারলে তো বিকল্প ব্যবসা দিতে হতো না। বিয়ের পর দুই পরিবার খুশি হয়ে যা দেয়, তাতেই আমি খুশি। এমনও বিয়ে দিয়েছি, যেখানে ৩০ হাজার টাকা বকশিশ পেয়েছি। আবার সাধারণভাবে একটি বিয়ে করিয়ে দিলে ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।

স্বপনের কাছে ঘটকালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুই পক্ষকে সঠিক তথ্য দেওয়া। তিনি বলেন, নয়ছয় করি না বলেই পাত্র-পাত্রীর জীবনবৃত্তান্তসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দুই পরিবারকে বুঝিয়ে দিই। এরপর তারা নিজেরা যাচাই-বাছাই করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।

চৌমাথা বাজারে তার দোকানে একদিকে ক্রেতারা হাঁস-মুরগি ও মাংস কিনতে আসেন, অন্যদিকে কেউ কেউ খোঁজ নেন পাত্র-পাত্রীর। ফলে দোকানটি এখন শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, অনেকের কাছে বিয়ের সম্ভাব্য সম্পর্কেরও এক অদ্ভুত ঠিকানা।

শহিদুল ইসলাম স্বপনের স্বপ্ন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া চালিয়ে যাওয়া। তার কাছে ব্যবসার পাশাপাশি ঘটকালি এখন দুই দশকের পরিচিতি, সম্পর্ক ও মানুষের আস্থার একটি অংশ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন

Back to top button