ঢাকার সাভারে সাত বছরের শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় মামলার এক সপ্তাহ পর মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। তবে কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি সাভার মডেল থানা-পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত উপজেলার পূর্ব শাহীবাগ এলাকায় মাদ্রাসাটিতে অভিযান চালানো হয়।
পুলিশ জানায়, সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি অপারেশন) আব্দুস সবুরের নেতৃত্বে পুলিশের দুটি টিম মাদ্রাসায় যান। মাদ্রাসার মক্তব শাখায় শিক্ষার্থী ও উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন ও অভিযোগ ওঠা ছাত্রদের নথিপত্র যাচাই করেন। শিক্ষকদের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এ সময় অভিযুক্ত ছাত্র ও শিক্ষকরা পলাতক রয়েছেন বলে সেখানে উপস্থিতরা জানান। দীর্ঘ সময় সেখানে উপস্থিত শেষে পুলিশ সদস্যরা ফিরে আসেন। তবে অভিযানের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা।
তবে বিকালে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপারেশন ট্রাফিক উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রথমে ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের থানায় আসেনি। তারা আদালতে যখন বিষয়টি নিয়ে যায়, তখন আদালতের নির্দেশে সাভার মডেল থানায় আমরা মামলাটি রুজু করি। মামলা রুজু করার পরপরই আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য আমাদের একাধিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একইসঙ্গে, আমরা আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চালাই। কিন্তু আজ আসামিদের পাওয়া যায়নি, তারা পলাতক।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে এমনও বলা হয়েছে, মামলার একজন আসামি সাদপন্থি নেতা হওয়ায় ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালানো যাবে না। চালালে উল্টো থানায় আক্রমণ হতে পারে।
যেসব ছাত্রের নাম মামলায় দেওয়া হয়েছে প্রত্যেকের বয়স ১৩ ও এর নিচে বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।
মাদ্রাসাটির বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষক লোকমান বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা আমাদের সঙ্গে তাবলিগ জামাত করতেন। ১০-১২ দিন আগে তিনি আমাদের এখানে এসে হাঁকডাক করে হুজুরকে (মোহতামিম) ডাকতে থাকেন। হুজুর নিচে এসে দেখতে পান তিনি তাকে গালিগালাজ করছেন, তার হাতে দেশিয় অস্ত্র।
লোকমান বলেন, বড় হুজুর একজন মাদ্রাসার প্রধান, আমাদের তাবলিগের মুরব্বি। তিনি আন্তর্জাতিক একজন ব্যক্তিত্বও। তিনি বিষয়টির বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন সেদিনই। কেউ যদি অন্যায়-অপরাধ করে থাকে, তাহলে তদন্ত করা হোক। তাকে শাস্তির আওতায় আনা হোক। কেউ যদি এ ধরনের কাজ করে থাকে, তার পরীক্ষা করা হোক, তার আলামত পরীক্ষা করা হোক।
মামলায় যা বলা হয়েছে
এর আগে, ওই শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় সরাসরি পাঁচ শিক্ষার্থী ও পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেন ভুক্তভোগীর বাবা। গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলাটি রুজু করে।
শিশুটির বাবা জানান, তার সন্তান ওই মাদ্রাসায় আবাসিক থেকে পড়াশোনা করে। সম্প্রতি সে বাড়ি ফিরে মনমরা হয়ে পড়ে ও মাদ্রাসায় ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। এক পর্যায়ে মাদ্রাসার অপর শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে তিনি জানতে পারেন, সেখানে শিশু শিক্ষার্থীদের ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে এবং কয়েক দিন আগে এ নিয়ে মাদ্রাসায় বিচারও হয়েছে।
এরপর তিনি ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। গত ১৪ আগস্ট শিশুটি পরিবারের সদস্যদের কাছে তাকে ধর্ষণের কথা শিকার করে বলে দাবি করেন তার বাবা।
তার অভিযোগ, চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তার ছেলেকে ধর্ষণ করে।
এরপর তিনি মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া বিন কাশেমের কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরদিন তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তার বাবা। ওই চিকিৎসক শিশুটিকে পরীক্ষা করে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। গত ১৮ আগস্ট শিশুটিকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়ার পরামর্শ দেন। ওই দিনই শিশুটিকে ওসিসিতে নেওয়া হয় এবং সেখানে চার দিন ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানান তার বাবা।
পরে পরিচিত এক আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত শিশুটির জবানবন্দি গ্রহণ করে সাভার মডেল থানাকে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পর গত ২৬ আগস্ট থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। তবে এখনও কোনও আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিশুটির বাবা।
