
আর কদিন পরই আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়বে পবিত্র মাহে রমজান। মুসলমানদের জীবনে রমজান কেবল একটি উপবাসের মাস নয়—এ এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, সংযম ও নৈতিক পুনর্জাগরণের সময়। এই মাস আমাদের প্রতিদিনের যান্ত্রিক জীবনকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: আমরা কেমন মানুষ হতে চাই?
রমজানের মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া—আত্মসংযম ও আল্লাহ ভীতির চর্চা। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা তার বাহ্যিক রূপ মাত্র। প্রকৃত রোজা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষ মিথ্যা, হিংসা, অন্যায় ও অহংকার থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে পারে। আজকের সমাজে, যেখানে ভোগবাদ ও আত্মকেন্দ্রিকতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে, সেখানে রমজান আমাদের শেখায় সহমর্মিতা, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ।
রমজান আমাদের দৃষ্টি ফেরায় সমাজের সেই মানুষগুলোর দিকে, যারা প্রতিদিন না খেয়েই দিন কাটান। ক্ষুধা কেমন অনুভূতি—তা রোজাদার নিজে অনুভব করে বলেই গরিব-দুঃখীর কষ্ট হৃদয়ে নাড়া দেয়। যাকাত, ফিতরা ও দানের মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার যে আহ্বান রমজান জানায়, তা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের এই সময়ে রমজান হতে পারে মানবিক সহানুভূতির এক শক্তিশালী মাধ্যম।
তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রে রমজান এলেই দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়, মজুতদারি ও অসাধু ব্যবসার প্রবণতা চোখে পড়ে। যে মাস আমাদের সংযম শেখায়, সেই মাসেই যদি লোভ ও অসততার প্রদর্শন ঘটে, তবে তা রমজানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখানে রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী সমাজ ও ভোক্তা—সবারই নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।
রমজান আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও সময়। আমরা কি আমাদের কথাবার্তায় আরও সংযত হতে পারি না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো, অসহিষ্ণু মন্তব্য—এসব থেকে কি আমরা বিরত থাকতে পারি না? রমজান আমাদের শেখায়, প্রকৃত ধার্মিকতা আচরণে প্রকাশ পায়, কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়।
এই মাস পরিবার ও সমাজের বন্ধন দৃঢ় করারও সুযোগ। একসঙ্গে ইফতার, তারাবির নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত—সবকিছু মিলিয়ে রমজান আমাদের জীবনে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। এই আবহ যেন মাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে না যায়—সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।
আসন্ন রমজান হোক আমাদের জন্য নতুন করে মানুষ হওয়ার সুযোগ। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসর—সবখানেই যেন রমজানের শিক্ষা প্রতিফলিত হয়। সংযম, সততা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ—এই চারটি গুণ যদি আমরা রমজান থেকে সারা বছরের জীবনে নিয়ে যেতে পারি, তবেই রমজান সার্থক হবে।
রমজান মোবারক।
ফাহাদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক
বাংলা ম্যাগাজিন




