খেলাফুটবল

লুকা মদরিচ: এক যোদ্ধার বিদায়ী উপাখ্যান

ম্যাচের একদমই শেষ মুহূর্ত। সমতা ফেরাতে প্রয়োজন একটি গোল। ক্রোয়েশিয়া গোল করল ঠিকই, কিন্তু ভিএআরে অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হতেই হতাশায় ভেঙে পড়ল ক্রোয়াটরা। রেফারির সিদ্ধান্ত যেন মানতেই পারছিলেন না লুকা মদরিচ। চোখে অশ্রু নিয়ে বিদায় নিলেন নাম্বার টেন।

ক্রোয়েশিয়ার সেই গোলটি বাতিল না হলে কি হতো? হয়তো লড়াকু ক্রোয়েশিয়াকে দেখা যেত পরের রাউন্ডে, কিংবা কে জানে— বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও উঁচুতে। কিন্তু ভাগ্য আজ সহায় হলো না। রাউন্ড অব ৩২-র ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিল ক্রোয়েশিয়া। আর সেই সঙ্গে অবসান ঘটল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার লুকা মদরিচের গৌরবময় বিশ্বকাপ যাত্রার।

৪০ বছর বয়সী এই ক্রোয়াট আইকনের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপটিই ছিল বৈশ্বিক মঞ্চের শেষ অধ্যায়। ক্রোয়েশিয়ার সোনালী প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিয়ে মাত্র ৪০ লাখ মানুষের এই ছোট্ট দেশটিকে ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন মদরিচ।

আজ ক্রোয়েশিয়ার হয়ে নিজের ২০২ নম্বর আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন মদরিচ। এই ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার সেরা পারফর্মার ছিলেন তিনি নিজেই। পুরো ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৬৬ বার বল স্পর্শ করা, ৩টি সফল ট্যাকল এবং দ্বিতীয়ার্ধে দুটি বিপজ্জনক ক্রস—সব মিলিয়ে মাঠজুড়ে মদরিচের উপস্থিতি ছিল চিরচেনা।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলেন মদরিচ। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে জেতেন মর্যাদাপূর্ণ গোল্ডেন বল। ২০১৮ সালের সেই সোনালী অধ্যায়ে এই ক্রোয়াট মিডফিল্ডার ব্যালন ডি’অর এবং ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছিলেন।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়ে মদরিচের জাদুকরী মিডফিল্ডের ওপর ভর করেই তৃতীয় স্থান অর্জন করে ক্রোয়েশিয়া।

দীর্ঘ দুই দশক ধরে মোট পাঁচটি বিশ্বকাপে (২০০৬, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬) দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন মদরিচ। বিশ্বকাপে মোট ২৩টি ম্যাচ খেলে ইতালির কিংবদন্তি পাওলো মালদিনির পাশে নাম লিখিয়েছেন তিনি। বিশ্বমঞ্চে ২টি গোল রয়েছে মদরিচের নামের পাশে।

ম্যাচশেষে সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে জড়িয়ে ধরেন মদরিচ। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করে একসঙ্গে জিতেছেন ৪টি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো তাঁর সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থকে নিয়ে বলেন, ‘লুকার সঙ্গে আমি অসংখ্য ম্যাচ খেলেছি এবং আমাদের বয়সও প্রায় কাছাকাছি। ও ফুটবল ইতিহাসের এক সত্যিকারের কিংবদন্তি। ম্যাচ শেষে আমি তাকে বলেছি—’তুমি ক্যারিয়ারে যা কিছু অর্জন করেছ, সবকিছুর জন্য তোমাকে অভিনন্দন। তোমার সঙ্গে আবারও দেখা হলে আমার খুব ভালো লাগবে এবং তোমার ক্যারিয়ারের আগামী বছরগুলোর জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।’ তার বিপক্ষে আবারও মাঠে নামতে পারাটা সত্যিই দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল।’

মদরিচের বিদায়টা হয়তো আগের দুটি বিশ্বকাপের মতো সাফল্যমণ্ডিত হয়নি, তবে ফুটবল মাঠে নিজের শেষ ছোঁয়াটুকু দিয়ে গেছেন এই মিডফিল্ড মায়েস্ত্রো। বরাবরের মতোই নিখুঁত পাসিং আর ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত দলকে টেনে নিয়ে গেছেন তিনি।

২০০৬ সালে জার্মানির নুরেমবার্গ স্টেডিয়াম থেকে শুরু হয়ে কানাডার টরোন্টো স্টেডিয়ামে শেষ হলো মদরিচের বিশ্বকাপ পথচলা। আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে। বিদায় লুকা মদরিচ, বিশ্বকাপ মঞ্চ আপনাকে মিস করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন

Back to top button